
সামনে ঈদ-উল-আজহা বা কোরবানি ঈদ। এই উৎসবের অন্যতম প্রধান আনন্দই হলো পরিবারের সবাই মিলে কোরবানির মাংসের নানা পদের স্বাদ নেওয়া। তবে মাংস কাটার পর বড় একটি চিন্তা তৈরি হয় তা সংরক্ষণ করা নিয়ে। আমাদের দেশে অনেকের ঘরেই ফ্রিজ নেই, আবার অনেকের ফ্রিজ থাকলেও কোরবানির বিপুল পরিমাণ মাংসের তুলনায় তা পর্যাপ্ত নয়। এর ওপর গ্রীষ্মের এই সময়ে লোডশেডিংয়ের সমস্যা তো রয়েছেই।
তবে ফ্রিজ নেই বা ফ্রিজে জায়গা নেই বলে দুশ্চিন্তা করার কিছু নেই। আমাদের দেশে আবহমানকাল থেকে ফ্রিজ ছাড়াই প্রাকৃতিকভাবে মাংস দীর্ঘদিন ভালো রাখার বেশ কিছু কার্যকর ও ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি প্রচলিত আছে। আসুন জেনে নেওয়া যাক ফ্রিজ ছাড়াই কোরবানির মাংস দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করার চমৎকার কিছু উপায়।

হলুদ ও লবণ দিয়ে জ্বাল দিয়ে রাখা
ফ্রিজ ছাড়া মাংস ভালো রাখার সবচেয়ে সহজ এবং প্রাচীন পদ্ধতি হলো হলুদ ও লবণ দিয়ে তা জ্বাল দিয়ে রাখা। মাংস কাটার পর ভালো করে ধুয়ে পানি ঝরিয়ে নিতে হবে। এরপর তাতে পরিমাণমতো হলুদ এবং একটু বেশি পরিমাণে লবণ মাখিয়ে চুলায় বসিয়ে দিতে হবে। মাংস থেকে যে পানি বের হবে, তাতেই মাংস সিদ্ধ হয়ে যাবে। এই পদ্ধতিতে মাংস প্রতিদিন অন্তত দুইবার করে সকাল ও রাতে ভালো করে ফুটিয়ে বা জ্বাল দিয়ে রাখতে হবে। এভাবে রাখলে মাংস অন্তত ৪ থেকে ৫ দিন পর্যন্ত একদম ভালো থাকে।
মাংস সাতলে বা আধা-ভাজি করে রাখা
মাংসের টুকরো বড় বড় করে কেটে লবণ ও সামান্য মসলা দিয়ে হালকা তেলের ওপর ভেজে রাখাকে মাংস সাতলে রাখা বলে। এই পদ্ধতিতে মাংসের ভেতরের আর্দ্রতা বা পানির পরিমাণ কমে যায়। পানি শুকিয়ে যাওয়ার কারণে ব্যাকটেরিয়া বা অন্য কোনো অণুজীব মাংসে বংশবৃদ্ধি করতে পারে না। সাতলানো মাংস প্রতিদিন নিয়ম করে গরম করতে হবে। এভাবেও বেশ কয়েকদিন মাংস নষ্ট না করে খাওয়া সম্ভব।

রান্না করে সংরক্ষণ
কোরবানির দিন বা পরের দিন ফ্রিজে জায়গা না হলে মাংস ভালো করে রান্না করে ফেলা একটি দারুণ বুদ্ধির কাজ। তবে সাধারণ রান্নার চেয়ে মাংস সংরক্ষণের জন্য মসলা, তেল এবং লবণের পরিমাণ কিছুটা বেশি দিতে হবে। তেল চর্বি মাংসের ওপরে একটি আস্তরণ তৈরি করে, যা বাইরের বাতাস ও জীবাণু থেকে মাংসকে রক্ষা করে। রান্না করা মাংস প্রতিদিন নিয়ম করে অন্তত দুইবার করে খুব ভালো করে ফুটিয়ে নিতে হবে, যাতে কোনো জলীয় অংশ না থাকে।
শুঁটকি করে মাংস সংরক্ষণ
মাংস দীর্ঘদিন, এমনকি কয়েক মাস পর্যন্ত সংরক্ষণ করার অন্যতম সেরা উপায় হলো মাংসের শুঁটকি বা রোদ্রে শুকিয়ে রাখা। এই পদ্ধতিতে চর্বি ছাড়া সলিড মাংস লম্বালম্বি ও চিকন ফালি করে কেটে নিতে হবে। এরপর সামান্য লবণ ও হলুদ মাখিয়ে রোদে কড়া করে শুকাতে হবে। মাংসের ভেতরের সব পানি শুকিয়ে যখন তা শক্ত হয়ে যাবে, তখন এটি টিন বা কাঁচের বায়ুরোধী পাত্রে রেখে দিলে মাসের পর মাস ভালো থাকে। খাওয়ার সময় গরম পানিতে কিছুক্ষণ ভিজিয়ে রাখলেই মাংস নরম হয়ে যায়।

বরফ দিয়ে মাংস সংরক্ষণ
সাময়িক সময়ের জন্য মাংস তাজা রাখতে বরফ অত্যন্ত কার্যকরী। যদি আপনার এলাকায় হঠাৎ দীর্ঘ সময় লোডশেডিং হয় বা তাৎক্ষণিকভাবে মাংস রাখার জায়গা না পাওয়া যায়, তবে একটি বড় কন্টেইনার বা থার্মোকলের বাক্সে প্রচুর বরফ কুচি দিয়ে তার মধ্যে মাংস চেপে রেখে দেওয়া যায়। তবে মনে রাখতে হবে, বরফ গলে যেন পানি মাংসের গায়ে জমে না থাকে। বাক্সের নিচে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখতে হবে। এই উপায়ে অন্তত ১২ থেকে ২৪ ঘণ্টা মাংস একদম তাজা রাখা সম্ভব।
চর্বিতে ডুবিয়ে রাখা বা কনফি পদ্ধতি
এই পদ্ধতিটি গ্রামীণ এলাকায় বেশ জনপ্রিয়। মাংসের চর্বিগুলোকে প্রথমে কড়াইতে জ্বাল দিয়ে তরল বা তেল বানিয়ে নিতে হবে। এরপর সেই ফুটন্ত চর্বির মধ্যে মাংসের টুকরোগুলো দিয়ে ভালোভাবে রান্না করতে হবে। রান্না শেষে মাংসের পাত্রটি ঠান্ডা হয়ে গেলে চর্বি জমে শক্ত হয়ে যাবে এবং মাংসের টুকরোগুলো চর্বির স্তরের নিচে ঢাকা পড়ে থাকবে। বাতাস না ঢোকার কারণে এই মাংস অনেকদিন পর্যন্ত ভালো থাকে। খাওয়ার সময় চর্বি থেকে মাংস তুলে গরম করে নিলেই চলে।