
হিজরি বর্ষপঞ্জির দ্বিতীয় মাস হলো সফর। কিন্তু আমাদের সমাজসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এ মাসকে ঘিরে নানা কুসংস্কার ও ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে। কেউ মনে করেন সফর অশুভ বা বিপদ-আপদের মাস। কেউ আবার এ মাসে বিয়ে, নতুন ব্যবসা বা গুরুত্বপূর্ণ কাজ শুরু করতে নিরুৎসাহিত করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রায়ই এসব ভিত্তিহীন দাবি ছড়িয়ে পড়ে।
প্রশ্ন হলো- সফর মাস নিয়ে এসব বিশ্বাসের কি কোনো ভিত্তি কোরআন ও সহিহ হাদিসে রয়েছে? ইসলামি আকিদার আলোকে এ বিষয়ে আলেমরা কী বলেন?
ইসলামের আগমনের আগে আরব সমাজে সফর মাসকে অশুভ মনে করার প্রবণতা ছিল। তারা বিশ্বাস করত, এ মাসে বেশি বিপদ-আপদ নেমে আসে। রাসুলুল্লাহ (স.) এই বিশ্বাসকে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করেছেন।
তিনি বলেন- ‘রোগের কোনো সংক্রমণ নেই, কুলক্ষণ বলে কিছু নেই, পেঁচা অশুভের লক্ষণ নয়, সফর মাসের কোনো অশুভ নেই।’ (সহিহ বুখারি: ৫৭০৭)
মুহাদ্দিসদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, রাসুলুল্লাহ (স.)-এর ‘লা সফারা’ ঘোষণা জাহেলি যুগে প্রচলিত সফর-সংক্রান্ত কুসংস্কারকে প্রত্যাখ্যান করেছে। সে সময় আরবদের একাংশ সফর মাসকে অশুভ মনে করত এবং এ মাসকে কেন্দ্র করে নানা ভিত্তিহীন বিশ্বাস প্রচলিত ছিল। অধিকাংশ আলেমের মতে, হাদিসটি মূলত সেই কুসংস্কারেরই খণ্ডন।
কোরআন ও সুন্নাহর মৌলিক শিক্ষা হলো, কোনো সময় বা দিন অশুভ নয়। বিপদ-আপদ আল্লাহর পরীক্ষা কিংবা মানুষের কর্মফল হিসেবে আসে, যা নির্দিষ্ট কোনো মাসের ওপর নির্ভরশীল নয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোনো বিপদ আসে না।’ (সুরা তাগাবুন: ১১)
অন্য আয়াতে আল্লাহ স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন- ‘পৃথিবীতে এবং তোমাদের নিজেদের ওপর যে বিপদই আসে, তা সৃষ্টি করার আগেই আমি কিতাবে (লাওহে মাহফুজে) লিপিবদ্ধ করে রেখেছি।’ (সুরা হাদিদ: ২২)
এ আয়াতগুলো থেকে স্পষ্ট হয় যে, বিপদ-আপদ আল্লাহর পূর্বনির্ধারিত ফয়সালার অংশ; এটি নির্দিষ্ট কোনো মাস বা দিনের কারণে ঘটে না।
সমাজে প্রচলিত একটি ধারণা হলো, সফর মাসে বিয়ে করলে সংসারে অশান্তি আসে কিংবা নতুন ব্যবসা ও বাড়ি নির্মাণ শুরু করলে অমঙ্গল ঘটে। ইসলামি শরিয়তে এ ধরনের বিশ্বাসের কোনো ভিত্তি নেই।
ইসলামের ইতিহাসে সফর মাসে হিজরতের প্রস্তুতি, বিভিন্ন সামরিক অভিযান এবং বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। পাশাপাশি শরিয়তে এমন কোনো দলিল নেই, যা সফর মাসে বিয়ে বা বৈধ কাজ শুরু করতে নিষেধ করে। ফলে এ মাসকে স্বভাবগতভাবে অশুভ মনে করার কোনো সুযোগ নেই। একজন মুসলিমের দায়িত্ব হলো অশুভ লক্ষণে বিশ্বাস না করে আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে শরিয়তসম্মত উপায়ে কাজ করা।
সফর মাসের শেষ বুধবারকে অনেক স্থানে ‘আখেরি চাহার সোম্বা’ হিসেবে পালন করা হয়। অনেকে বিশ্বাস করেন এ দিনে বিশেষ ইবাদত করলে বিপদ দূর হয়। তবে কোরআন কিংবা সহিহ হাদিসে সফর মাসের শেষ বুধবারের জন্য বিশেষ ইবাদত বা নির্দিষ্ট আমলের কোনো নির্ভরযোগ্য দলিল পাওয়া যায় না। একইভাবে এ মাসকে কেন্দ্র করে বিশেষ গোসল, দোয়া লিখে পানি পান করা (শিফানামা) কিংবা নির্দিষ্ট কিছু রীতি পালনের পক্ষেও নির্ভরযোগ্য কোনো প্রমাণ নেই। তাই এসব লোকাচারকে শরিয়ত নির্ধারিত আবশ্যক আমল মনে করার সুযোগ নেই।
ইমাম ইবনু রাজাব হাম্বলি (রহ.) তাঁর ‘লাতায়েফুল মাআরিফ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, সফর মাস অন্য মাসগুলোর মতোই একটি মাস। এই মাসে একজন মুসলিমের করণীয় হলো-
১. সব ধরনের কুসংস্কার ও অশুভ বিশ্বাস থেকে দূরে থাকা।
২. পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, কোরআন তেলাওয়াত ও জিকিরে যত্নবান হওয়া।
৩. তওবা-ইস্তেগফার ও নফল ইবাদতে মনোযোগী হওয়া।
৪. আল্লাহর ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল রাখা এবং সব কাজে তাঁর কাছেই সাহায্য চাওয়া।
৫. যেকোনো বৈধ কাজ, বিয়ে বা ব্যবসা শুরু করতে অশুভ ধারণার কারণে বিলম্ব না করা।
সফর মাসকে অশুভ মনে করা, এ মাসে বিয়ে বা নতুন কাজ থেকে বিরত থাকা কিংবা বিশেষ কোনো দিনকে বিপদমুক্তির দিন মনে করা- এসব বিশ্বাসের পক্ষে কোরআন ও সহিহ হাদিসে নির্ভরযোগ্য কোনো দলিল নেই। ইসলামে ইবাদত ও বিশ্বাসের ভিত্তি হলো বিশুদ্ধ দলিল। তাই কুসংস্কার নয়, বরং আল্লাহর ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল, কোরআন-সুন্নাহর অনুসরণ এবং নেক আমলের মাধ্যমেই একজন মুসলিমের জীবন পরিচালিত হওয়া উচিত।
তথ্যসূত্র: সুরা তাগাবুন: ১১; সুরা হাদিদ: ২২; সহিহ বুখারি: ৫৭৫৪, ৫৭৫৭, ২৬৯৭; সহিহ মুসলিম: ২২২৪, ২২২২, ১৭১৮; ইবনু কাসির, তাফসিরুল কুরআনিল আজিম; ইবনু হাজার আল-আসকালানি, ফাতহুল বারি; ইবনু রাজাব হাম্বলি, লাতায়েফুল মাআরিফ