Saturday, April 13, 2024
HomeScrollingফিতরা কেন দেবেন, কাকে দিলে বেশি সওয়াব পাবেন

ফিতরা কেন দেবেন, কাকে দিলে বেশি সওয়াব পাবেন

সদকা মানে দান, আর ফিতর মানে রোজার সমাপন বা ঈদুল ফিতর। অর্থাৎ ঈদুল ফিতরের দিন আদায় করা সদকাকেই সদকাতুল ফিতর বলা হয়। এটি ওয়াজিব বিধান। জাকাতের নিসাবের সমপরিমাণই ফিতরার নিসাব। অর্থাৎ কারো কাছে সাড়ে সাত ভরি সোনা বা সাড়ে বায়ান্ন ভরি রুপা অথবা তার সমমূল্যের নগদ অর্থ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের অতিরিক্ত হয়ে ঈদুল ফিতরের দিন সুবহে সাদিকের সময় বিদ্যমান থাকলে— তার ওপর ফিতরা ওয়াজিব হবে। ইসলামি শরিয়তে ‘ছোট-বড়, স্বাধীন-পরাধীন ও নারী-পুরুষ সবার ওপরই এটি ওয়াজিব।’ (সহিহ বুখারি: ১৫১২)

যার ওপর সদকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব, তিনি নিজের পক্ষ থেকে যেমন আদায় করবেন, তেমন নিজের অধীনদের পক্ষ থেকেও আদায় করবেন। তবে এতে জাকাতের মতো বর্ষ অতিক্রম হওয়া শর্ত নয়। (ফাতহুল কাদির: ২/২৮১)

ঈদুল ফিতরের দিন সুবহে সাদিকের সময় সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব হয়। তাই ঈদের দিন সুবহে সাদিকের আগে কোনো শিশুর জন্ম হলে তার পক্ষ থেকে সদকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব হবে, ঈদের দিন সূর্যোদয়ের পর কোনো শিশুর জন্ম হলে তার পক্ষ থেকে সদকাতুল ফিতর দিতে হবে না। ফতোয়ার কিতাবে এসেছে, পবিত্র রমজানের শেষ দিনেও যে নবজাতক দুনিয়ায় এসেছে কিংবা কোনো ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করেছে, তার পক্ষ থেকেও সদকাতুল ফিতর আদায় করতে হবে। (ফতোয়া আলমগিরি: ১/১৯২)

সদকাতুল ফিতর আদায়ের মাধ্যমে দুইটি উদ্দেশ্য পূরণ হয়। একটি হলো রমজানে হওয়া ত্রুটি-বিচ্যুতি মাফ হয়, আরেকটি হলো- গরিবের ঈদটা সুন্দর হয়। হাদিস শরিফে এসেছে, ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) সদকাতুল ফিতরকে অপরিহার্য করেছেন, অর্থহীন, অশালীন কথা ও কাজে রোজার যে ক্ষতি হয়েছে তা পূরণের জন্য এবং নিঃস্ব লোকের আহার জোগানোর জন্য। (আবু দাউদ: ১৬০৯)

ঈদের নামাজের পূর্বে আদায় করলে তা সদকাতুল ফিতর হিসাবে গণ্য হবে। আর ঈদের নামাজের পর আদায় করলে তা অন্যান্য সাধারণ দানের মতো একটি দান হবে। (আবু দাউদ: ১৬০৯; ইবন মাজাহ: ১৮২৭; মুস্তাদরাকে হাকেম: ১/৪০)

যাদের সদকাতুল ফিতর দেবেন

কোরআন মজিদে উল্লেখিত জাকাত দেওয়ার নির্দিষ্ট আটটি খাতই হলো সদকাতুল ফিতরের খাত। ওই আটটি খাতেই সদকাতুল ফিতর দেবেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মূলত সদকা হলো ফকির, মিসকিন, জাকাতকর্মী, অনুরক্ত ব্যক্তি ও নওমুসলিম, ক্রীতদাস, ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি, আল্লাহর পথে (ইসলামের সুরক্ষার জন্য) ও বিপদগ্রস্ত বিদেশি মুসাফির ও পথসন্তানদের জন্য। এটি আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞানী ও পরম কৌশলী।’ (সুরা তওবা: ৬০)

যাদের সদকাতুল ফিতর দিলে বেশি সওয়াব পাবেন
আপন ভাইবোন, ভাগনে–ভাগনি, ভাতিজা–ভাতিজি, চাচা–জেঠা–ফুফু, মামা–খালা; চাচাতো–জেঠাতো ভাইবোন, ফুফাতো ভাইবোন, মামাতো–খালাতো ভাইবোন এবং অন্য নিকটাত্মীয় যদি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক না হন এবং গরিব হন তাহলে তাদেরকে সদকাতুল ফিতর বা জাকাত দেওয়া যাবে। বরং তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া উত্তম। কারণ হাদিসে আছে নিকটাত্মীয়দের দান করলে দ্বিগুণ সওয়াব হয়—প্রথমত, দানের সওয়াব; দ্বিতীয়ত, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার সওয়াব। (সুনানে নাসায়ি: ২৫৮২)

যাদের সদকাতুল ফিতর দেওয়া যাবে না
১. কাফির
২. নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক।
৩. নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিকের নাবালক সন্তান।
৪. বনু হাশেমের লোক।
৫. মা-বাবা, দাদা-দাদি, নানা-নানি—এভাবে ওপরের স্তরের কাউকে জাকাত দেওয়া যাবে না। অর্থাৎ যাদের মাধ্যমে দুনিয়ায় এসেছে, তাদেরসহ ওপরের স্তরের কাউকে জাকাত দেওয়া যাবে না।
৬. নিজের মাধ্যমে যারা দুনিয়ায় এসেছে, অর্থাৎ ছেলে-মেয়ে ও তাদের সন্তানাদি একইভাবে তাদের সন্তানদেরও জাকাত দেওয়া যাবে না।
৭. স্ত্রী ও স্বামী একে অন্যকে জাকাত দিতে পারবে না।
৮. মসজিদ-মাদরাসা, পুল, রাস্তা, হাসপাতাল বানানোর কাজে ও মৃতের দাফনের কাজে জাকাতের টাকা দেওয়া যাবে না।
(ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া: ১/১৮৮, ১৮৯; তাতারখানিয়া: ৩/২০৬; আদদুররুল মুখতার: ৩/২৯৪, ২৯৫)

ফিতরার পরিমাণ নবীজি যেভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছেন
হাদিসে নবীজি (স.) উন্নত মানের খেজুর, মধ্যম মানের খেজুর, পনির, যব, কিসমিস ও গম -এই পাঁচটি খাদ্যদ্রব্যের যেকোনো একটির মাধ্যমে সদকাতুল ফিতর আদায় করার অনুমতি দিয়েছেন। এগুলোর মূল্য অনুযায়ী সদকাতুল ফিতরের সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ পরিমাণ নির্ধারিত হয়। খেজুর, পনির, যব ও কিশমিশের ক্ষেত্রে শরিয়ত নির্ধারিত পরিমাণ হচ্ছে এক ‘সা’ বা ৩২৭০.৬০ গ্রাম (প্রায়)—অর্থাৎ তিন কেজি ২৭০ গ্রামের কিছু বেশি। গমের ক্ষেত্রে নিসফে ‘সা’ বা ১৬৩৫.৩১৫ গ্রাম, অর্থাৎ এক কেজি ৬৩৫ গ্রামের কিছু বেশি প্রযোজ্য হবে। (আওজানে শরইয়্যাহ, পৃ. ১৮)

এ বছর (১৪৪৫ হিজরি) বাংলাদেশ সরকারের সদকাতুল ফিতর নির্ধারণ কমিটির পক্ষ থেকে বাংলাদেশে সাদাকাতুল ফিতরের পরিমাণ জনপ্রতি সর্বনিম্ন ১১৫ টাকা ও সর্বোচ্চ ২ হাজার ৯৭০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আমাদের সমাজে দেখা যায়, যাদের উন্নতমানের আজওয়া খেজুরের মূল্য দিয়ে সদকাতুল ফিতর আদায় করার সামর্থ্য আছে, তারাও সর্বনিম্ন গমের মূল্য দিয়ে সদকাতুল ফিতর আদায় করে। অনুরূপভাবে যাদের কিসমিসের মূল্য দিয়ে আদায় করার সামর্থ্য আছে, তারাও গমের মূল্য দিয়ে আদায় করেন। এটি সঠিক পদ্ধতি নয়। নবী কারিম (স.)-কে সর্বোত্তম দান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি ইরশাদ করেন- أغلاها ثمنا وأنفسها عند أهلها ‘দাতার নিকট যা সর্বোৎকৃষ্ট এবং যার মূল্যমান সবচেয়ে বেশি’। (সহিহ বুখারি, কিতাবুল ইতক ৩/১৮৮; সহিহ মুসলিম, কিতাবুল ঈমান: ১/৬৯)

সুতরাং উচিত হলো, নিজেদের সামর্থ অনুযায়ী সদকাতুল ফিতর আদায় করা। যতটা সম্ভব সর্বোচ্চ দামেরটা দেওয়া। আল্লাহ তাআলা তাওফিক দান করুন। আমিন।

RELATED ARTICLES
Continue to the category

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

Recent Comments