
পাকিস্তানের কারাবন্দী সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দৃষ্টিশক্তি এখন প্রায় স্বাভাবিক এবং তিনি কোনো চশমা ছাড়াই স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন বলে দেশটির সুপ্রিম কোর্টকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা জেল কর্তৃপক্ষ।
সোমবার (১৭ আগস্ট) জেল সুপারের পক্ষ থেকে জমা দেওয়া দুই পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, কারাগারে ইমরান খানের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হচ্ছে এবং বর্তমানে তার চোখ ও সার্বিক শারীরিক অবস্থা বেশ স্থিতিশীল।
মূলত চলতি বছরের শুরুতে ইমরান খানের ডান চোখে ‘সেন্ট্রাল রেটিনাল ভেইন অক্লুশন’ নামক জটিল রোগ ধরা পড়েছিল, যার ফলে তিনি ডান চোখের প্রায় ৮৫ শতাংশ দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন বলে তার আইনজীবীরা আদালতকে জানিয়েছিলেন। পরে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে গঠিত বিশেষ মেডিকেল বোর্ডের অধীনে তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)-এর প্রতিষ্ঠাতার নিবিড় চিকিৎসা শুরু হয়।
জেল কর্তৃপক্ষ সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসলামাবাদ ও রাওয়ালপিন্ডির শীর্ষ চক্ষু বিশেষজ্ঞদের দীর্ঘ চিকিৎসার পর ইমরান খানের চোখের সমস্যা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে তিনি কোনো প্রকার চশমা ছাড়াই অনায়াসে পবিত্র কুরআন ও বই পড়তে পারছেন
আদালতকে জেল প্রশাসন আশ্বস্ত করেছে, পিটিআই প্রধানের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের আগস্টের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা ইমরান খানের মোট ৩৯ বার স্বাস্থ্য পরীক্ষা সম্পন্ন করেছেন। সরকারি চিকিৎসকদের সেই সমস্ত পরামর্শের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ জেল রেকর্ড বুকে সংরক্ষিত রয়েছে।
এছাড়া সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রতিদিন তিন বেলার খাবার ও পানীয় কঠোরভাবে পরীক্ষা করে পরিবেশন করা হয় বলেও জানায় জেল কর্তৃপক্ষ।
এদিকে মেডিকেল রিপোর্টের পাশাপাশি ইমরান খানের সাথে তার পরিবারের সদস্যদের সাক্ষাতের বিবরণও সুপ্রিম কোর্টে পেশ করা হয়েছে। জেলের নিয়ম অনুযায়ী প্রতি মঙ্গলবার তিনি তার স্ত্রী বুশরা বিবির সাথে দেখা করছেন এবং এ পর্যন্ত তাদের মধ্যে মোট ৮৪টি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
তবে প্রতিবেদনে আদালতের নির্দেশ অমান্য করার কিছু অভিযোগও তুলেছে জেল কর্তৃপক্ষ। তাদের দাবি, কারাগারে ইমরান খানের সাথে দেখা করার পর কতিপয় রাজনৈতিক প্রতিনিধি ও আইনজীবী আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে জেলের ভেতরেই গণমাধ্যমের সাথে কথা বলছেন, যা বিচার বিভাগ এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে জনমতকে উসকে দিচ্ছে।
বিচারপতি শাহিদ ওয়াহিদের নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্টের তিন সদস্যের একটি বেঞ্চ আগমীকাল মঙ্গলবার ইমরান খানের স্বাস্থ্য এবং জেলের সুযোগ-সুবিধা সংক্রান্ত এই মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেছেন। আদালত এই সন্তোষজনক মেডিকেল রিপোর্টের ভিত্তিতে মামলার পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করবেন।
প্রসঙ্গত, গত সপ্তাহে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাবেক পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মৃত্যুর তীব্র গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল, যা পরে পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং তার পরিবার সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দেয়।
যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী পাকিস্তানি সাংবাদিক ওয়াজাহাত সাঈদ খানের দুটি ভিডিও প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে এই বিভ্রান্তি তৈরি হয়।
তিনি দাবি করেছিলেন, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদর দপ্তরের (জিএইচকিউ) কর্মকর্তারা ইমরানের বেঁচে থাকা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
এদিকে খবরটি সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে পাকিস্তান জুড়ে পিটিআই সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক ও উত্তেজনা তৈরি হয়। যদিও পরে ওই সাংবাদিক স্পষ্ট করেন ইমরানের মৃত্যুর কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ তার কাছে নেই। কারাগারের অতিরিক্ত গোপনীয়তার কারণে শুধু আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গণসংযোগ শাখা (আইএসপিআর) একটি জরুরি ও বিরল আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়ে জানায়, ইমরান খান সম্পূর্ণ সুস্থ ও জীবিত আছেন এবং আদিয়ালা কারাগারেই বন্দি রয়েছেন।
এছাড়াও ইমরানের স্ত্রী বুশরা বিবির পরিবারও সিসিটিভি ফুটেজে ইমরান খানকে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে দেখে তার বেঁচে থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করে।
মূলত এই মৃত্যুর গুজবের পর তৈরি হওয়া চরম উদ্বেগের কারণেই, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে মেডিকেল বোর্ড গঠন করে তার দৃষ্টিশক্তি ও সার্বিক স্বাস্থ্যের এই ইতিবাচক রিপোর্টটি আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের ক্ষমতায় ছিলেন ইমরান খান। ওই বছর পার্লামেন্টে অনাস্থা ভোটে হেরে ক্ষমতাচ্যুত হন তিনি। এর এক বছর পর দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য ফাঁসের মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে যান তিনি।
চলতি সপ্তাহে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এক বিবৃতিতে ইমরান খান ও বুশরা বিবিকে তাদের পরিবার ও আইনজীবীদের সঙ্গে দেখা করার ‘নিঃশর্ত অধিকার ফিরিয়ে দিতে’ পাকিস্তান কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনটি বলেছে, এই দুজনকে অবশ্যই পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা দিতে হবে। তাদের বেআইনিভাবে যে নির্জন কারাবাসে রাখা হয়েছে, তা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
সূত্র: ডন