
নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের গল্প বলার রসবোধ ছিল একেবারে আলাদা। তাঁর রসিকতা কাউকে আঘাত করত না। ছোট ছোট বাক্যের মাধ্যমে পাঠকের মনে আমোদ দিতেন। হিমুর যুক্তিহীন উদাসীনতা, মিসির আলির অতি যুক্তি কিংবা শুভ্রর সরলতা— প্রতিটি চরিত্রের নিজস্ব একটা রসবোধ ছিল। আর যদি বলা হয় ‘বাকের ভাই’ কিংবা ‘রূপা’-এর কথা, তবে তো কথাই নেই। ছোট পর্দার নাটক থেকে শুরু করে উপন্যাসের পাতা সবখানে ছিল তাঁর হাসির চাবুক।
হিমুর সংলাপগুলো এখনও পাঠকদের মুখে মুখে ফেরে। চরিত্রের ভেতরে অদ্ভুত সব বৈপরীত্য তৈরি করে তিনি পাঠককে হাসান। আবার কখনও জীবন সম্পর্কে গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করেন। সাহিত্য সমালোচকদের মতে, হুমায়ূন আহমেদের সবচেয়ে বড় সার্থকতা হলো তিনি গুরুগম্ভীর সাহিত্যের দেয়াল ভেঙে আমজনতার লেখক হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে পেরেছিলেন।

আজ কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের ১৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯ জুলাই নিউইয়র্কের একটি হাসপাতালে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। দীর্ঘ কর্মজীবনে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, গীতিকার, নাট্যকার, চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিভার ছাপ রেখেছেন।
১৯৭২ সালে প্রকাশিত প্রথম উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’ পাঠকমহলে এতটাই নন্দিত হয়েছিল যে তাঁকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি। তাঁর লেখা গানগুলো এখনও মানুষের মুখে মুখে। চলচ্চিত্র পরিচালনায়ও পেয়েছিলেন ব্যাপক সফলতা। ‘আগুনের পরশমণি’, ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘ঘেটুপুত্র কমলা’, ‘দুই দুয়ারী’, ‘নয় নম্বর বিপদ সংকেত’ দর্শক ও সমালোচকদের মন জয় করেছে। তেমনি ছোট পর্দার নাটক ‘খেলা’, ‘অচিন বৃক্ষ’, ‘খাদক’, ‘একি কাণ্ড’, ‘একদিন হঠাৎ’, ‘অন্যভুবন’ দর্শকমহলে এখনও আলোচনার খোরাক জোগায়।

এছাড়া টেলিভিশন ধারাবাহিক ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘বহুব্রীহি’, ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘নক্ষত্রের রাত’, ‘অয়োময়’, ‘আজ রবিবার’, ‘তারা তিনজন’, ‘সবুজ সাথী’, ‘উড়ে যায় বকপঙ্খী’, ‘এই মেঘ এই রৌদ্র’-এর সংলাপ নিয়ে এখনও চর্চা হয়।
১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার কুতুবপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন হুমায়ূন আহমেদ। শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করলেও নব্বইয়ের দশকে স্বেচ্ছায় অবসর নেন এবং লেখালেখিতে মনোযোগ দেন। চাকরি ছাড়ার আগেই তাঁর লেখা বেশ কয়েকটি নাটক ও উপন্যাস ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি দুটি বিয়ে করেছেন। প্রথম স্ত্রীর নাম গুলতেকিন আহমেদ। ২০০৩ সালে হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে তাঁর বিচ্ছেদ হয়। এরপর ২০০৪ সালে গায়িকা ও অভিনেত্রী শাওনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি।
বাংলা সাহিত্যে অবদানের জন্য ১৯৯৪ সালে একুশে পদক লাভ করেন তিনি। এছাড়া বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৮১), হুমায়ূন কাদির স্মৃতি পুরস্কার (১৯৯০), লেখক শিবির পুরস্কার (১৯৭৩), জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (১৯৯৩ ও ১৯৯৪), বাচসাস পুরস্কারসহ (১৯৮৮) অসংখ্য সম্মাননা পেয়েছেন নন্দিত এ কথাসাহিত্যিক।