
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলন আরও জোরালো রূপ নিয়েছে। আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ছে ভারতের বিভিন্ন রাজ্য ও কলকাতার মতো বড় বড় শহরগুলোতেও।
বুধবার (২২ জুলাই) সকাল থেকেই অনশনমঞ্চে শিক্ষার্থী, তরুণ, সমাজকর্মী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের ভিড় বাড়তে থাকে।
আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবি, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ এবং শিক্ষাব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। আন্দোলনের অন্যতম মুখ সোনম ওয়াংচুক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকলেও অনশন অব্যাহত রেখেছেন বলে তার ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে।

আন্দোলন শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ভারতের ‘দালাল’ মিডিয়া আন্দোলনের খবর আড়াল করার চেষ্টা করছে। এ কারণে তারা আন্দোলনরত শিক্ষার্ধীদের সমাবেশ থেকে বেশ কয়েকজন সরকারপন্থি গণমাধ্যমের সাংবাদিককে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করে দেন।
অন্যদিকে আন্দোলনকারীরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তারা যন্তর মন্তর ছাড়বেন না। এই আন্দোলনের প্রভাব এখন ভারতের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশেও পৌঁছেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক ও সান হোসে, যুক্তরাজ্যের লন্ডন এবং আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে প্রবাসীদের উদ্যোগে সংহতি কর্মসূচি পালিত হয়েছে।
বিভিন্ন মানবাধিকারকর্মী ও প্রবাসী ভারতীয়রা সেখানে সমাবেশ করে আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানান এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি তোলেন।
দিল্লিতে আন্দোলন ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপও বাড়ছে। ছাত্র ও যুবকদের বিক্ষোভে পুলিশের লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহারের অভিযোগে মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারি বাসভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন বিরোধী নেতা রাহুল গান্ধী।

পরে তাকে আটক করা হলে সেখান থেকেই তিনি সরকারের কাছে পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরেন। রাহুলের দাবির মধ্যে রয়েছে- কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার, বিক্ষোভকারীদের ওপর বলপ্রয়োগের অভিযোগে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ, সরকারের প্রকাশ্য দুঃখপ্রকাশ এবং সংসদে এ ঘটনায় বিস্তারিত আলোচনা।
সংসদের উচ্চকক্ষেও বিষয়টি তুলেছে তৃণমূল কংগ্রেস। দলটির প্রধান সচেতক নাদিমুল হক ছাত্র আন্দোলনে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে আলোচনার দাবি জানিয়ে নোটিশ দিয়েছেন।
এর আগে মঙ্গলবার (২১জিুলাই) পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও প্রকাশ্যে আন্দোলনকারীদের প্রতি সমর্থন জানান। তৃণমূলের সংসদ সদস্য মহুয়া মৈত্রও আন্দোলনের পক্ষে সরব রয়েছেন।
তিনি যন্তর মন্তরে গিয়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন এবং সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত এক বার্তায় বলেছেন, সরকারের সব চেষ্টা সত্ত্বেও আন্দোলনকারীরা অনশনমঞ্চ ছেড়ে যাননি। তিনি কটাক্ষ করে বলেন, এই আন্দোলন সরকারের জন্য পাঠ্যসূচির বাইরের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে আন্দোলনের অন্যতম মুখপাত্র সৌরভ দাস অভিযোগ করেছেন, তার সামাজিক মাধ্যমের বার্তা আদানপ্রদানের হিসাব সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তিনি এর প্রতিবাদ জানিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, আন্দোলনের কণ্ঠস্বর কি এভাবে থামিয়ে দেওয়া সম্ভব।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একটি শিক্ষাবিষয়ক আন্দোলন ধীরে ধীরে বৃহত্তর রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থার জবাবদিহির দাবি ছাড়িয়ে এখন আন্দোলনের কেন্দ্রে এসেছে পুলিশি ভূমিকা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে বিতর্ক।

সরকারের পক্ষ থেকে এখনো আন্দোলনের প্রধান দাবিগুলোর বিষয়ে নতুন কোনো ঘোষণা আসেনি। তবে যন্তর মন্তরে আন্দোলনকারীদের অবস্থান অব্যাহত থাকায় এবং দেশ-বিদেশে সংহতি কর্মসূচি বাড়তে থাকায় পরিস্থিতির দিকে নজর রয়েছে রাজনৈতিক মহল ও প্রশাসনের।
ভারতে নিট (এনইইটি) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্যে জাতীয় মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা পুরোপুরি বাতিলের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছে তামিলাগা ভেট্ট্রি কাজাগম (টিভিকে)। অভিনেতা বিজয়ের নেতৃত্বাধীন দলটি বলেছে, তারা শুধু পরীক্ষায় অনিয়মের বিরোধিতা করছে না; বরং নিট ব্যবস্থারই অবসান চায়।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) দেওয়া এক বিবৃতিতে টিভিকে জানায়, চিকিৎসাশিক্ষায় ভর্তি নির্ধারণে জাতীয় পর্যায়ের এই পরীক্ষার পরিবর্তে বিকল্প ব্যবস্থা চালুর পক্ষে তারা ‘অটল ও আপসহীন’ অবস্থানে রয়েছে।
দলটির দাবি, শিক্ষা খাতকে সংবিধানের সমবর্তী তালিকা (কনকারেন্ট লিস্ট) থেকে সরিয়ে রাজ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এতে রাজ্য সরকারগুলো শিক্ষা ও চিকিৎসাশিক্ষা–সংক্রান্ত বিষয়ে পূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পাবে।
টিভিকে আরও বলেছে, যদি সাংবিধানিক বা আইনগত কারণে তাৎক্ষণিকভাবে এ পরিবর্তন সম্ভব না হয়, তাহলে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে বিশেষ একটি সমবর্তী তালিকা গঠন করে শিক্ষা খাতে রাজ্যগুলোর ক্ষমতা বাড়ানো যেতে পারে।
বিবৃতিতে দলটি দাবি করেছে, এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে চিকিৎসাশিক্ষাসহ সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর রাজ্যগুলোর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।
একই সঙ্গে নাম উল্লেখ না করেই প্রধান বিরোধী দল ডিএমকের সমালোচনা করেছে টিভিকে। তাদের অভিযোগ, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে জনগণের প্রত্যাশা তৈরি করে পরে তা বাস্তবায়ন না করার রাজনীতি থেকে সরে আসা উচিত। উল্লেখ্য, ২০২১ সালের তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনের আগে ক্ষমতায় এলে নিট বাতিলের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ডিএমকে।
সোমবার (২০ জুলাই) ‘চলো সংসদ’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে যন্তর মন্তরে তৈরি করা আন্দোলনের মঞ্চ ভেঙে দেয় দিল্লি পুলিশ। একই দিন সংসদ অভিমুখে মিছিল নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ছুড়ে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে।
সংঘর্ষে বহু আন্দোলনকারী ও পুলিশ সদস্য আহত হন। আহতদের মধ্যে এক তরুণীর অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাকে দিল্লির রাম মনোহর লোহিয়া (আরএমএল) হাসপাতালে ভেন্টিলেশন সাপোর্টে রাখা হয়েছে। ওই সংঘর্ষে ১০০ জনের বেশি আহত হন।
এদিকে চলমান আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারি বাসভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস।
এদিন দলটির নেতারা প্রথমে সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের বাসভবনের সামনে জড়ো হয়। সেখান থেকে হেঁটে রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ কংগ্রেসের শীর্ষ নেতারা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে যান। সেখানে অবস্থান কর্মসূচি পালন করার সময় কংগ্রেসের কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে আটক করে দিল্লি পুলিশ। এ সময় রাহুল গান্ধীর নাক দিয়ে রক্ত ঝরতে দেখা যায়।
কর্মসূচির আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে রাহুল গান্ধী বলেন, শিক্ষার্থীদের ওপর চালানো সহিংসতার জবাব চাইতেই তারা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে গেছেন। তিনি প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেন।
একই দিন রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী হাসপাতালে গিয়ে আহত আন্দোলনকারীদের খোঁজ নেন। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জগৎ প্রকাশ নাড্ডাও আরএমএল ও লেডি হার্ডিঞ্জ হাসপাতালে গিয়ে আহতদের চিকিৎসার অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজখবর নেন।
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু বলেন, প্রশ্নফাঁস রোধ করা জাতীয় দায়িত্ব এবং দায়ীদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হবে।
তবে বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী অভিযোগ করেছেন, বিচার চাওয়া শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জ চালিয়ে সরকার তরুণ সমাজের কণ্ঠরোধের চেষ্টা করছে। তার ভাষায়, নরেন্দ্র মোদি ভারতের ইতিহাসের সবচেয়ে ‘তরুণবিরোধী’ প্রধানমন্ত্রী।
‘ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) সংসদ অভিযানে ‘পুলিশি জুলুমের’ অভিযোগে কান দিল না সুপ্রিম কোর্ট। নিট-কাণ্ডে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করে সংসদের পথে মিছিল করেছিল সিজেপি। তাদের ঠেকাতে লাঠি চালায় পুলিশ। চলে কাঁদানে গ্যাস, জলকামান। পুলিশ মিছিলকারীদের উপরে ‘অত্যাচার’ চালিয়েছে অভিযোগ করে শীর্ষ আদালতের স্বতঃপ্রণোদিত হস্তক্ষেপ চেয়েছিলেন এক আইনজীবী।
এ নিয়ে জরুরি শুনানির আবেদন খারিজ করে দেয় প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের ডিভিশন বেঞ্চ। সেদিনের ঘটনার ভিডিও আদালতকে দেখাতে চেয়েছিলেন আবেদনকারী আইনজীবী। প্রধান বিচারপতি সাফ বলে দেন, ‘‘আমাদের সময় নষ্ট করবেন না।’’