
ফেসবুক, এক্স, ইউটিউব, হোয়াটসঅ্যাপ কিংবা অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ব্যক্তিগত মতামত প্রকাশ, ছবি-ভিডিও শেয়ার, অন্যের পোস্টে মন্তব্য কিংবা কোনো ঘটনার স্ক্রিনশট প্রকাশ- এসব যেন দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
কিন্তু অনেক সময় না বুঝেই এমন কিছু লেখা, মন্তব্য বা শেয়ার করা হয়, যা ইসলামের দৃষ্টিতে গিবতের পর্যায়ে পড়তে পারে। সামনাসামনি কাউকে নিয়ে কথা বললেই শুধু গিবত হয়—এমন ধারণা সঠিক নয়। অনলাইনেও একটি স্ট্যাটাস, একটি কমেন্ট, এমনকি একটি ‘শেয়ার’ বা ‘মিম’ কারও সম্মানহানির কারণ হলে তা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
গিবতের সবচেয়ে স্পষ্ট সংজ্ঞা দিয়েছেন রাসুলুল্লাহ (স.)।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, একদিন রাসুলুল্লাহ (স.) সাহাবিদের জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কি জানো, গিবত কী? সাহাবিরা বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই ভালো জানেন। তিনি বললেন, তোমার ভাই সম্পর্কে এমন কথা বলা, যা সে অপছন্দ করে। তখন জিজ্ঞেস করা হলো, আমি যা বলছি, তা যদি সত্যিই তার মধ্যে থাকে? তিনি বললেন, যদি তা তার মধ্যে থাকে, তুমি তার গিবত করলে। আর যদি তা না থাকে, তুমি তার বিরুদ্ধে অপবাদ দিলে। (সহিহ মুসলিম: ২৫৮৯)
অর্থাৎ কোনো ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে তার এমন দোষ বা অপছন্দনীয় বিষয় বলা, লেখা, ইঙ্গিত করা বা প্রচার করা, যা সে প্রকাশ হওয়া পছন্দ করবে না, সেটিই গিবত।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা একে অপরের গিবত করো না। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? নিশ্চয়ই তোমরা তা ঘৃণা করবে। আর আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।’ (সুরা হুজরাত: ১২)
এই উপমার মাধ্যমে কোরআন গিবতের ভয়াবহতা স্পষ্ট করে দিয়েছে। আলেমদের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে করা গিবত অনেক সময় আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। কারণ একটি লেখা বা ভিডিও মুহূর্তেই অসংখ্য মানুষের কাছে পৌঁছে যায় এবং দীর্ঘ সময় ধরে ছড়িয়ে থাকতে পারে।
১. নাম উল্লেখ করে কারও দোষ প্রকাশ করা
কোনো ব্যক্তির নাম বা পরিচয় প্রকাশ করে তার ব্যক্তিগত ত্রুটি, পারিবারিক সমস্যা কিংবা চরিত্রগত দুর্বলতা নিয়ে পোস্ট দেওয়া গিবতের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, যদি তা শরিয়তসম্মত প্রয়োজন ছাড়া করা হয়।
২. নাম না লিখেও এমন ইঙ্গিত দেওয়া, যাতে সবাই বুঝে যায়
অনেকে নাম গোপন রাখলেও এমনভাবে ঘটনা বর্ণনা করেন যে পরিচিত মানুষ সহজেই বুঝে যায় কাকে উদ্দেশ্য করে লেখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রেও গিবতের হুকুম প্রযোজ্য হতে পারে।
৩. ব্যক্তিগত চ্যাট বা ইনবক্সের স্ক্রিনশট প্রকাশ
মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ বা অন্যকোনো ব্যক্তিগত আলাপচারিতার স্ক্রিনশট অনুমতি ছাড়া প্রকাশ করা ইসলামি নৈতিকতার পরিপন্থী। এর মাধ্যমে কারও দোষ বা গোপন বিষয় প্রকাশ পেলে তা গিবত বা অন্যায় অপমানের পর্যায়ে চলে যাবে।
৪. কারও শারীরিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে ব্যঙ্গ করা
গায়ের রঙ, উচ্চতা, ওজন, চেহারা কিংবা শারীরিক সীমাবদ্ধতা নিয়ে ট্রল, মন্তব্য বা ব্যঙ্গ করা ইসলামে নিরুৎসাহিত বিষয়। মানুষের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে এমন আচরণ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
৫. বিব্রতকর ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া
কেউ দুর্ঘটনায় পড়ে গেলেন, ভুল করলেন বা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়লেন—এমন ভিডিও বিনোদনের জন্য ছড়িয়ে দেওয়া তাঁর সম্মানহানির কারণ হবে।
৬. ট্রল, মিম বা ব্যঙ্গচিত্র তৈরি করা
কাউকে ছোট করা, হাসির পাত্র বানানো বা সামাজিকভাবে হেয় করার উদ্দেশ্যে ছবি সম্পাদনা করে ‘মিম’ তৈরি করা কিংবা ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট ছড়িয়ে দেওয়া গিবত বা উপহাসের অন্তর্ভুক্ত হবে।
৭. কারও অতীতের গুনাহ প্রকাশ করা
কোনো ব্যক্তি অতীতে ভুল করেছিলেন, পরে তাওবা করেছেন বা জীবন পরিবর্তন করেছেন। এমন অবস্থায় তাঁর অতীত টেনে এনে সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করা ইসলামি আদবের পরিপন্থী।
৮. পরিবার বা বংশ নিয়ে কটাক্ষ করা
কারও বাবা-মা, পরিবার, আর্থিক অবস্থা বা বংশপরিচয় নিয়ে বিদ্রূপ করা শুধু গিবতই নয়, অনেক ক্ষেত্রে এটি অপমান ও অহংকারেরও প্রকাশ।
৯. গ্রুপ চ্যাটে কারও সমালোচনা করা
অনেকে মনে করেন, প্রকাশ্যে নয়; কয়েকজনের ব্যক্তিগত গ্রুপে আলোচনা করলে সমস্যা নেই। কিন্তু কোনো ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে তাঁর অপছন্দনীয় বিষয় আলোচনা করা সেখানেও গিবত হবে।
১০. অন্যের পোস্টে অপমানজনক মন্তব্য করা
কারও পোস্টের নিচে গিয়ে ব্যক্তিগত আক্রমণ, পুরোনো ভুল তুলে ধরা বা সম্মানহানিকর মন্তব্য করা একজন মুসলমানের শোভা পায় না। অনেক ক্ষেত্রেই এটি গিবত, কষ্ট দেওয়া কিংবা অপমানের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
না। ইসলামে কিছু ক্ষেত্রে প্রয়োজনের কারণে অন্যের দোষ বা আচরণ উল্লেখ করা বৈধ। যেমন-
তবে এসব ক্ষেত্রেও উদ্দেশ্য হতে হবে সত্য প্রতিষ্ঠা বা ক্ষতি প্রতিরোধ; কাউকে হেয় করা নয়।
মোটকথা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখা প্রতিটি শব্দই একজন মুসলমানের আমলের অংশ। একটি স্ট্যাটাস, একটি মন্তব্য বা একটি শেয়ার- সবই আল্লাহর কাছে হিসাবের বিষয়। তাই কোনো পোস্ট দেওয়ার আগে নিজেকে একটি প্রশ্ন করা যেতে পারে, ‘যার সম্পর্কে লিখছি, তিনি যদি এটি দেখেন, কষ্ট পাবেন কি?’
যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তাহলে সেই পোস্ট থেকে বিরত থাকাই নিরাপদ। কারণ একজন মুমিনের ভাষা ও কলম যেমন মানুষের উপকারে আসে, তেমনি তা যেন কারও সম্মানহানির কারণ না হয়-সেদিকেও সমানভাবে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।