
দেশজুড়ে একসঙ্গে তিন সংকটে নাকাল সাধারণ মানুষ। জুন-জুলাই মাসের অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল নিয়ে ক্ষোভ যখন তুঙ্গে, তখনই ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং, বাসাবাড়িতে গ্যাসের সংকট এবং শিল্পাঞ্চলে জ্বালানির ঘাটতি জনভোগান্তিকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। অনেক গ্রাহকের অভিযোগ, বিদ্যুতের ব্যবহার প্রায় একই থাকলেও বিল এসেছে দুই থেকে পাঁচ গুণ বেশি। এরই মধ্যে মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনার পর গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনও কমেছে। ফলে একদিকে অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিলের চাপ, অন্যদিকে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস না পাওয়ার বাস্তবতায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন দেশের মানুষ।
ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল নিয়ে ক্ষোভ
জুন ও জুলাই মাসের বিদ্যুৎ বিল নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। রাজধানী থেকে জেলা শহর, এমনকি গ্রামাঞ্চলের অনেক গ্রাহকও অভিযোগ করছেন, আগের মাসের তুলনায় তাদের বিদ্যুৎ বিল অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। কারও বিল দ্বিগুণ, কারও তিনগুণ, আবার কোথাও পাঁচ গুণ পর্যন্ত বেশি এসেছে।
সামাজিক মাধ্যমে বিদ্যুৎ বিলের কপি প্রকাশ করে ক্ষোভ জানাচ্ছেন অসংখ্য গ্রাহক। কেউ দাবি করেছেন, পুরো মাস বাড়িতে না থাকলেও আগের তুলনায় বেশি বিল এসেছে। আবার কেউ বলছেন, আগে যেখানে মাসে দুই হাজার টাকার কম বিল দিতেন, এবার সেখানে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা পরিশোধ করতে বলা হয়েছে।
রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা খায়রুল ইসলামের পরিবারের বিদ্যুৎ ব্যবহার গত কয়েক মাসে তেমন পরিবর্তন হয়নি। প্রতি মাসে তার বিল ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে থাকত। কিন্তু জুন মাসে তার বিল আসে প্রায় ৬ হাজার টাকা। হঠাৎ চার গুণের বেশি বিল দেখে তিনি সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ অফিসে অভিযোগ করেন। তার প্রশ্ন, ব্যবহার প্রায় একই থাকলেও বিল এত বেড়ে গেল কীভাবে?
একই ধরনের অভিযোগ করেছেন রাজধানীর মোহাম্মদপুর, মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকার গ্রাহকেরা। তাদের দাবি, জুন-জুলাই মাসে প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং হয়েছে। বিদ্যুৎ না থাকায় এসি, ফ্রিজসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রও স্বাভাবিকভাবে ব্যবহার করা যায়নি। তারপরও আগের মাসের তুলনায় দুই থেকে তিন গুণ বেশি বিল এসেছে। তাদের ভাষ্য, বিদ্যুৎ সরবরাহ কম থাকলে ব্যবহারও কম হওয়ার কথা। সে ক্ষেত্রে এত বেশি বিলের যৌক্তিকতা তারা খুঁজে পাচ্ছেন না।
শুধু পোস্টপেইড নয়, প্রিপেইড মিটারের গ্রাহকদের মধ্যেও একই ধরনের ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। রাজধানী ও আশপাশের এলাকার অনেক গ্রাহক বলছেন, আগে যে পরিমাণ টাকা রিচার্জ করলে প্রায় এক মাস বিদ্যুৎ ব্যবহার করা যেত, এখন একই পরিমাণ টাকা দুই সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। মিটার পরীক্ষা করিয়েও তারা স্পষ্ট কোনো কারণ জানতে পারেননি। তাদের অভিযোগ, বিদ্যুতের ব্যবহার আগের মতোই থাকলেও রিচার্জের টাকা অস্বাভাবিক দ্রুত কেটে যাচ্ছে।
সুশান্ত উৎসব নামে একজন বলেন, ১ হাজার টাকা রিচার্জ করে বিদ্যুৎ পেলাম ৭০৮ টাকার। মানে ২৯২ টাকা নাই। এর মধ্যে ডিমান্ড চার্জ ১৬৮, ভ্যাট ৪৭। কারা জানি বলেছিলেন মিটার ভাড়া নেবে না সরকার! আমার তো নিল ৮০ টাকা। এভাবে ১ হাজারে ৭০০ টাকা মানে ৩০০ টাকা নাই হয়ে যাওয়াকে সাগর-চুরি বলে মনে করি আমি।
এ ধরনের অভিযোগ শুধু একজন বা দুটি এলাকার নয়। মোহাম্মদপুর, মিরপুর, কেরানীগঞ্জ, উত্তরা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, কুমিল্লা, খুলনা, রাজশাহী ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অনেক গ্রাহকের দাবি, দিনের বড় অংশ লোডশেডিংয়ে কাটলেও তাদের বিদ্যুৎ বিল আগের তুলনায় কয়েক গুণ বেড়েছে।
এসব অভিযোগে স্পষ্ট, অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং দেশের বিভিন্ন এলাকায় একই ধরনের অভিযোগ ক্রমেই বাড়ছে। তাই বিষয়টি দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছভাবে তদন্তের দাবি জোরালো হচ্ছে।
পোস্টপেইড গ্রাহকদের অভিযোগ, কোথাও মিটার রিডিংয়ে ভুল হয়েছে, কোথাও অনুমাননির্ভর বিল করা হয়েছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে একাধিক মাসের ইউনিট একসঙ্গে সমন্বয় করায় বিল হঠাৎ বেড়ে গেছে। অনেক গ্রাহক বিল হাতে পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ অফিসে গিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অভিযোগ করছেন।
বিদ্যুৎ বিভাগের ব্যাখ্যা
অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগের পর বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিভাগটির কর্মকর্তাদের দাবি, জুন মাসে তীব্র গরমের কারণে সারা দেশে বিদ্যুতের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। বিশেষ করে এসি, ফ্রিজ, পাখা ও কুলারের ব্যবহার বাড়ায় অনেক গ্রাহকের বিদ্যুৎ খরচও আগের তুলনায় বেশি হয়েছে।
তাদের ভাষ্য, ঈদুল আজহার কারণে মে মাসে অনেক এলাকায় নির্ধারিত সময়ের আগেই মিটার রিডিং নেওয়া হয়। ফলে জুন মাসের বিলে অতিরিক্ত ১০ থেকে ১২ দিনের বিদ্যুৎ ব্যবহার যুক্ত হয়েছে। এ কারণেও অনেকের বিল স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি এসেছে। একই কারণে জুলাই মাসের বিলেও কিছু ক্ষেত্রে এমন প্রভাব পড়তে পারে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
এ ছাড়া কোথাও কোথাও মিটার রিডিংয়ে ভুল, বিল তৈরির ত্রুটি কিংবা একাধিক মাসের ইউনিট একসঙ্গে সমন্বয় করার কারণেও অস্বাভাবিক বিল হয়েছে বলে স্বীকার করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এসব অভিযোগ যাচাই করে প্রয়োজনীয় সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।
গ্রাহকদের প্রশ্ন
তবে বিদ্যুৎ বিভাগের ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন অনেক গ্রাহক। তাদের প্রশ্ন, গরমের কারণে বিদ্যুতের ব্যবহার কিছুটা বাড়লেও কীভাবে বিল দুই, তিন কিংবা পাঁচ গুণ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে?
অনেকের অভিযোগ, দিনের পর দিন লোডশেডিংয়ের কারণে এসি, ফ্রিজসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্র স্বাভাবিকভাবে ব্যবহারই করা যায়নি। এমন পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত ব্যবহারের যুক্তি তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। প্রিপেইড মিটারের গ্রাহকদেরও অভিযোগ, বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হলেও রিচার্জের টাকা অস্বাভাবিক দ্রুত কেটে যাচ্ছে।

এদিকে ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, শুধু তীব্র গরম বা অতিরিক্ত কয়েক দিনের বিদ্যুৎ ব্যবহার দিয়ে এত বড় বিলের পার্থক্য ব্যাখ্যা করা যায় না। কোথাও মিটার রিডিংয়ে ত্রুটি, কোথাও বিলিং ব্যবস্থার দুর্বলতা কিংবা প্রশাসনিক গাফিলতি রয়েছে কি না, সেটিও নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তদন্তের নির্দেশ সরকারের
বিতর্ক বাড়তে থাকায় বিদ্যুৎ বিভাগ দেশের সব বিতরণ কোম্পানিকে দ্রুত অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। সরকারি নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যেসব গ্রাহকের বিল ব্যবহারের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ, সেগুলো পুনরায় যাচাই করতে হবে। তদন্তে ভুল প্রমাণিত হলে সংশোধিত বিল দিতে হবে।
এ জন্য প্রতিটি বিদ্যুৎ বিতরণ অফিসে আলাদা অভিযোগ গ্রহণ সেল চালু করা হয়েছে। গ্রাহকরা বিল, মিটারের তথ্য ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র নিয়ে সেখানে আবেদন করতে পারবেন। প্রয়োজনে মিটার পুনঃপরীক্ষার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, জুন মাসের অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগ সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। বিতরণ কোম্পানিগুলোকে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোথাও অনিয়ম, অবহেলা বা অসাধু কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ইকবাল মাহমুদ বলেন, গরমের কারণে বিদ্যুতের ব্যবহার কিছুটা বাড়তে পারে। তবে প্রকৃত কারণ কী, সেটি তদন্ত করেই নিশ্চিত হওয়া হবে। কোনো গ্রাহক যেন অন্যায়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সে বিষয়টি সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।
নাগরিক সমাজের উদ্বেগ
জুন মাস থেকে বিদ্যুতের দাম প্রায় ২০ শতাংশ বাড়ার পরই জুলাই মাসে অনেক গ্রাহকের অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল পাওয়ার অভিযোগ উদ্বেগ বাড়িয়েছে। অনেকের দাবি, আগের তুলনায় বিল দুই থেকে পাঁচ গুণ পর্যন্ত বেড়েছে। এতে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। অভিযোগের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জোরালো হচ্ছে।
বাংলাদেশ সাধারণ নাগরিক সমাজের আহ্বায়ক মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, বিল বৃদ্ধির প্রকৃত কারণ নির্ধারণে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত করতে হবে। মিটার রিডিং, বিলিং সফটওয়্যার বা প্রযুক্তিগত ত্রুটি থাকলে তা দ্রুত সংশোধনের পাশাপাশি অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

সংগঠনটি অস্বাভাবিক বিলের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি, বিল পুনর্মূল্যায়ন, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিতর্কিত বিলে জরিমানা বা সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করা এবং ভবিষ্যতে এমন সমস্যা এড়াতে বিলিং ব্যবস্থার নিয়মিত প্রযুক্তিগত নিরীক্ষার দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে গ্রাহকদের বিলের কপি, মিটারের রিডিং ও প্রয়োজনীয় তথ্য সংরক্ষণ করে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিলের আহ্বান জানানো হয়েছে।
বাড়তি বিলের ক্ষোভের মধ্যে বাড়ছে লোডশেডিং
বিদ্যুৎ বাড়তি বিল নিয়ে যখন বিতর্ক তুঙ্গে, তখনই দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতিও দ্রুত অবনতির দিকে যেতে শুরু করেছে। মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনার পর গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ফলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের (পিজিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত ১৪৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে অন্তত ৬২টি কোনো না কোনোভাবে জ্বালানি সংকটে রয়েছে। এর মধ্যে গ্যাসভিত্তিক ২৬টি, তরল জ্বালানিভিত্তিক ৩৩টি এবং কয়লাভিত্তিক দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। ফলে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না।
মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) টার্মিনালে গত ২১ জুলাই অগ্নিকাণ্ড ও কারিগরি ত্রুটির পর থেকেই দেশের জ্বালানি পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি শুরু হয়। টার্মিনালটির কার্যক্রম আংশিক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ এক ধাক্কায় ১৭ শতাংশের বেশি কমে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে।
এর আগে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন গড়ে ২৬০ থেকে ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ২১০ কোটি ঘনফুটে। অথচ দেশের দৈনিক চাহিদা প্রায় ৪১০ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় সরবরাহে প্রায় ২০০ কোটি ঘনফুটের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছে বিদ্যুৎ খাত। আগে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রতিদিন প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও বর্তমানে তা কমে ৬৮ থেকে ৭০ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে। ফলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন দেড় হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি কমেছে।
গত সপ্তাহে গড় উৎপাদন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৮২ মেগাওয়াট, যা আগের সপ্তাহে ছিল মাত্র ৩২০ মেগাওয়াট। ১ আগস্ট ঘাটতি বেড়ে ২ হাজার ১৭৪ মেগাওয়াটে পৌঁছে যায়। রোববার গভীর রাতে একপর্যায়ে ঘাটতি প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াটে ওঠে। দিনের বেলাতেও অনেক সময় ২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং করতে হয়েছে।
গ্রামাঞ্চলে ভোগান্তি বেশি
লোডশেডিংয়ের সবচেয়ে বড় চাপ পড়েছে জেলা ও গ্রামাঞ্চলে। অনেক এলাকায় দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। কোথাও ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র পাঁচ ঘণ্টা বিদ্যুৎ মিলছে। এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকার পর আবার এক বা দুই ঘণ্টা লোডশেডিং এখন অনেক এলাকার নিত্যদিনের ঘটনা।
ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলার একটি চালকলের মালিক জসিম উদ্দিন বলেন, একদিনে সাত ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় উৎপাদন কার্যত বন্ধ ছিল। আগে দুই-তিন ঘণ্টার লোডশেডিং কোনোভাবে সামলানো যেত, কিন্তু এখন পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে উঠেছে।
কৃষি খাতেও এর প্রভাব পড়েছে। কুমিল্লার মাছচাষি রহমত উল্লাহ জানান, বিদ্যুৎ না থাকায় সেচ পাম্প চালাতে টানা তিন রাত লেগেছে। এতে উৎপাদন ব্যয় যেমন বেড়েছে, তেমনি কাজও নির্ধারিত সময়ে শেষ করা সম্ভব হয়নি।
শিল্পে কমেছে উৎপাদন
গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে শিল্প খাতে। নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, ভালুকা, চট্টগ্রামসহ দেশের প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাসের চাপ প্রায় নেই বললেই চলে। অনেক কারখানা ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ সক্ষমতায় উৎপাদন করছে। কিছু কারখানা আবার সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে।
গ্যাস সংকটের পাশাপাশি ঘন ঘন লোডশেডিং শিল্প উৎপাদনকে আরও ব্যাহত করছে। অনেক প্রতিষ্ঠান ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করে উৎপাদন চালিয়ে নিচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। রফতানিমুখী শিল্পেও সময়মতো পণ্য সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আমিরুল হক বলেন, ‘গ্যাস সংকট শুধু শিল্পকারখানার সমস্যা নয়, এটি জাতীয় অর্থনীতির জন্যও বড় ঝুঁকি। দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে রফতানি আদেশ বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে।’
বাসাবাড়িতে জ্বলছে না চুলা
শিল্পের পাশাপাশি আবাসিক গ্রাহকদের দুর্ভোগও চরম আকার ধারণ করেছে। রাজধানীর মোহাম্মদপুর, আদাবর, মিরপুর, রামপুরা, উত্তরাসহ বিভিন্ন এলাকায় দিনের বেশিরভাগ সময় চুলায় গ্যাস থাকছে না। অনেক পরিবার গভীর রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করে রান্না করছেন। কেউ কেউ বিকল্প হিসেবে বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করছেন। এতে আবার বিদ্যুতের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।
সিএনজি স্টেশনগুলোতেও লাইন দীর্ঘ হচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস পাচ্ছেন না অনেকে। এতে কর্মঘণ্টার বড় অংশ লাইনে কাটছে এবং আয় কমে যাচ্ছে।
সরকারের আশ্বাস
গ্যাস সংকট নিয়ে সরকারও প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ করেছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটির কারণেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এটি সরকারি ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা নয়। তিনি আশা প্রকাশ করেন, খুব দ্রুত পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হবে।
জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদও বলেছেন, গ্যাস সংকট পুরোপুরি কবে শেষ হবে, সে প্রতিশ্রুতি এখনই দেওয়া সম্ভব নয়। তবে ক্ষতিগ্রস্ত এলএনজি টার্মিনালের মেরামতকাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে এবং আগামী ১০ আগস্টের মধ্যে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হতে পারে।
পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, ক্ষতিগ্রস্ত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের অক্ষত অংশ চালু করা গেলে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস যোগ হবে। পুরো টার্মিনাল সচল করতে বিদেশ থেকে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ আনা হয়েছে। বিদেশি প্রকৌশলীদের পাশাপাশি দেশীয় বিশেষজ্ঞরাও মেরামত কাজে যুক্ত রয়েছেন।
দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের চ্যালেঞ্জ
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংকট কেবল একটি এলএনজি টার্মিনালের দুর্ঘটনার ফল নয়। দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে বিনিয়োগের ঘাটতি, আমদানিনির্ভরতা এবং জ্বালানি খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
এ কারণে শুধু ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনাল মেরামত করলেই সংকট পুরোপুরি কাটবে না। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, নতুন গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়ন, এলএনজি আমদানির বিকল্প উৎস তৈরি এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানির বহুমুখীকরণ এখন সময়ের দাবি।
সরকার ইতোমধ্যে মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
তবে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা তারা চান, বিদ্যুৎ থাকুক, গ্যাসের চুলা জ্বলুক এবং অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিলের সঠিক ব্যাখ্যা ও দ্রুত সমাধান মিলুক। কারণ একই সময়ে বাড়তি বিল, দীর্ঘ লোডশেডিং এবং গ্যাস সংকটের ত্রিমুখী চাপে জনজীবন ও অর্থনীতি দুটিই কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েছে। এখন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু সংকট সামাল দেওয়া নয়, মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, ‘বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটে মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তিতে রয়েছে। প্রতিবছর বিভিন্ন কারণে এই সংকট আরও তীব্র হয়। যাদের সামর্থ্য আছে, তারা বিদ্যুৎচালিত চুলা বা জেনারেটরের মতো বিকল্প ব্যবহার করছেন, কিন্তু নিম্ন আয়ের মানুষের পাশে সরকারকেই দাঁড়াতে হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘সংকটের মধ্যে গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব গণবিরোধী। বরং গ্যাস সরবরাহে ব্যর্থতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের গ্যাস বিলে ছাড় দেওয়ার কথা সরকারের বিবেচনা করা উচিত।’
সুত্র-ঢাকা মেইল
সম্পাদক ও প্রকাশক- মেহেদী হাসান
Copyright © 2026 Livenews24bd সত্যের সাথে প্রতিদিন. All rights reserved.