
১৩টি দেশকে সঙ্গে নিয়ে সামরিক জোট গঠনের ঘোষণা দিয়েছে সৌদি আরব। যেখানে পাকিস্তান ও তুরস্কের পাশাপাশি রয়েছে বাংলাদেশের নামও। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে এই সংবাদ প্রকাশ হওয়ার পর থেকেই এ নিয়ে চলছে নানা আলোচনা।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের কারণে বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ। অন্য বিকল্প রুট লোহিত সাগরেও মাঝেমধ্যে হামলা চালাচ্ছে ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা। এমন অস্থির পরিস্থিতিতে বাব আল-মান্দেব প্রণালি, লোহিত সাগর এবং এডেন উপসাগরে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা রক্ষায় গঠিত নৌ সামরিক জোটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের তাৎপর্য কী?
সিদ্ধান্তটি কৌশলগত বলেই মত বিশ্লেষকদের। এর পেছনে জ্বালানি নিরাপত্তা, শ্রমবাজার, বাণিজ্য এবং মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যের জটিল হিসাবও জড়িত বলে তারা মনে করেন।
সামরিক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান পরিস্থিতিতে সামুদ্রিক প্রতিরক্ষায় বহুজাতিক জোট গঠনের এই সিদ্ধান্ত বেশ কৌশলি।
এখানে লাভের পাশাপাশি ঝুঁকিও দেখছেন বিশ্লষকরা। বিশেষ করে ইরানের সাথে সম্পর্ক এবং বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্নে।
তাদের মতে, এই জোটে যুক্ত হলে একদিকে যেমন ইরান এবং ইরান সমর্থিত বিভিন্ন গোষ্ঠির বিরোধিতার সম্মুখিন হতে হবে। অন্যদিকে এখান থেকে বিরত থাকলে সৌদি আরবের সঙ্গেও সম্পর্কের টানাপড়েন শুরু হতে পারে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের মতো বিষয়ও রয়েছে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত শুরুর পর বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবহনের রুট হরমুজ প্রণালি বর্তমানে কার্যত অচল হয়ে রয়েছে।
ইরান বারবার হুমকি দিয়েছে, প্রয়োজনে তারা এই প্রণালি বন্ধ করে দেবে। ফলে উপসাগরীয় দেশগুলো, বিশেষ করে সৌদি আরব বিকল্প পথ খুঁজতে শুরু করেছে। আর দেশটির হাতে সেই বিকল্প হলো লোহিত সাগর। সৌদি আরবের বেশিরভাগ তেল এখন লোহিত সাগর হয়ে রফতানি হচ্ছে।
কিন্তু এখানেও নতুন সংকট। লোহিত সাগরে সৌদি ও তাদের মিত্রদের তেলবাহী জাহাজে মাঝেমধ্যেই ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করেছে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহী গোষ্ঠী।
কয়েক সপ্তাহ আগে তারা বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে কার্যত নৌ-অবরোধের ঘোষণাও দিয়েছে। যার ফলে ওই পথ দিয়েও নৌযান চলাচলের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
ভৌগোলিকভাবে ইরিত্রিয়া, জিবুতি ও ইয়েমেনের মাঝখানে প্রায় ৩০ কিলোমিটারের একটি সরু চ্যানেল হলো বাব আল মান্দেব। যা লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগর এবং সেখান থেকে ভারত মহাসাগরের সাথে যুক্ত করেছে।
বিশ্বের প্রায় ১০ থেকে ১২ শতাংশ সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং প্রতিদিন ৪ থেকে ৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেল এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। হরমুজের পর এটিই বিশ্ব জ্বালানি পরিবহনের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ রুট।
যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে হরমুজ কার্যত বন্ধ, হুথিদের অবরোধের ঘোষণায় বাব আল মান্দেবও ঝুঁকিপূর্ণ- এই দুই চেকপয়েন্টে একসাথে অস্থিরতা মানে বিশ্ববাজারে তেলের দামে আরও অস্থিরতার শঙ্কা। আর তেলের দাম বাড়া মানেই বাংলাদেশের মতো আমদানি নির্ভর দেশের জন্য মুদ্রাস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপ।
এই প্রেক্ষাপটেই ‘বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট’ গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সৌদি আরব। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, জোটের মূল লক্ষ্য বাব আল-মান্দেব প্রণালি, লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরে নৌযান চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরব ছাড়া এই জোটের বাকি ১৩ সদস্য হলো- তুরস্ক, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, জর্ডান, মিশর, পাকিস্তান, জিবুতি, সোমালিয়া, বাংলাদেশ, ইয়েমেন, সুদান ও কোমোরোস। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ওমান এই জোটে নেই।
সৌদি আরবের সাথে বাংলাদেশের সামরিক সহযোগিতার ইতিহাস নতুন নয়। ১৯৯০ সালেও উপসাগরীয় যুদ্ধে সৌদি আরবের সুরক্ষায় সহযোগিতা করতে সেদেশে সেনা পাঠিয়েছিল বাংলাদেশ। এরপর যুদ্ধ শেষে কুয়েত পুনর্গঠনেও লজিস্টিক ও সেবামূলক কাজ করেছিল বাংলাদেশের সেনারা।
১৯৯০ সালে উপসাগরীয় যুদ্ধে বাংলাদেশের হয়ে অংশ নিয়েছিলেন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ড. নাসির উদ্দিন আহমেদ। সৌদি আরবের নেতৃত্বে বহুজাতিক সামুদ্রিক সামরিক জোটে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ দেখছেন সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা।

তিনি বলছেন, সৌদি আরব বাংলাদেশের সবচেয়ে বড়ো শ্রমবাজার। ২৫ লাখের বেশি বাংলাদেশি সেখানে কাজ করেন। ফলে সৌদির কোনো কৌশলগত অনুরোধে সাড়া না দিলে ভিসা, কোটা বা শ্রমবাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।
তার মতে, ‘সৌদির সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। তাদের অনুরোধে সাড়া দিতে হচ্ছে।’
এছাড়া বহুজাতিক জোটে অংশ নিলে বাংলাদেশ নৌবাহিনী আধুনিক নৌ-যুদ্ধ কৌশল, সাবমেরিন-বিধ্বংসী টহল, গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান ও যৌথ মহড়ার অভিজ্ঞতা পাবে। তুরস্ক, পাকিস্তান ও মিশরের মতো দেশের সাথে কাজ করার সুযোগ নৌ সক্ষমতা বাড়াবে বলেও মনে করেন মি. আহমেদ।
এক্ষেত্রে অর্থনৈতিক উদ্দেশ্যও দেখছেন এই বিশ্লেষক। তিনি বলছেন, লোহিত সাগরের ওপারেই আফ্রিকা মহাদেশ- এই জোটের মাধ্যমে আফ্রিকার পূর্ব উপকূলে বাংলাদেশের জন্য নতুন রফতানি বাজার ও জনশক্তি রফতানির সুযোগ তৈরি হতে পারে। আর লোহিত সাগর নিরাপদ থাকলে বাংলাদেশি পণ্যবাহী জাহাজগুলোও নিরাপদ থাকবে বলে মনে করেন তিনি।
সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, জোটটি সম্পূর্ণ রক্ষণাত্মক প্রকৃতির এবং এটি কোনো রাষ্ট্রকে লক্ষ্যবস্তু করবে না।
মূলত, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, যৌথ মহড়া, সমন্বিত টহল ও সমুদ্র যোগাযোগ স্বাভাবিক রাখতে কেবল জরুরি প্রয়োজনীয় কার্যক্রম চালাবে এই জোট। তবে সৌদি নেতৃত্বাধীন এই সামরিক জোটে যুক্ত হওয়ায় বাংলাদেশের জন্য বেশ কিছু ঝুঁকিও দেখছেন বিশ্লেষকরা।
এক্ষেত্রে ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েন তৈরি হওয়ার বিষয়টিকে সবচেয়ে বড়ো করে দেখা হচ্ছে। সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র এবং ইরানের কট্টর প্রতিপক্ষ। এই জোট কার্যত সৌদি-যুক্তরাষ্ট্র ব্লকের অংশ। তাই ইরান এটিকে কীভাবে দেখবে, এই প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠছে।
নৌবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা জে ইউ ভুঁইয়া বলছেন, ‘আমাদের যে-কোনো পদক্ষেপ ইরান মনে রাখবে। ইরান এই যুদ্ধে টিকে গেলে ভবিষ্যতে বড়ো শক্তি হবে। তখন আমাদের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে।’
এছাড়া, এটি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন না হওয়ায় সক্রিয় সংঘাতপূর্ণ এই এলাকায় ইরান বা হুথিরা সৌদি নেতৃত্বাধীন যে-কোনো জোটকে টার্গেট করতে পারে।
ড. নাসির উদ্দিন আহমেদ বলছেন, ‘জীবন বাজি রেখে আমাদের নৌ সদস্যরা সেখানে যাবে। ১৯৯০ সালে সৌদিতে আমাদের বেইজগুলোকে ব্রিটিশরা এয়ার প্রটেকশন দিয়েছিল। এবার সেই নিরাপত্তা কে দেবে?’
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বাংলাদেশ কূটনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নিয়েছে। সব পক্ষকে সংযত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। এখন সৌদি জোটে গেলে সেই নীতি কতটা ধরে রাখা যাবে, এই প্রশ্নও তুলছেন বিশ্লেষকরা।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতে গোটা পৃথিবীই এখন কূটনৈতিক দোটানায়। যদিও শুরু থেকেই কূটনৈতিকভাবে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও সতর্ক অবস্থান বজায় রাখার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ। কোনো পক্ষের সরাসরি বিরোধিতা বা সমর্থন না করে সব পক্ষকে সংযত থাকার এবং আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে ঢাকা।
কিন্তু সমুদ্র নিরাপত্তা ইস্যুতে সৌদি আরবের সঙ্গে সামরিক জোটে যুক্ত হলে বাংলাদেশের জন্য নিজের ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখা সম্ভব হবে কিনা, এই আলোচনাও সামনে আসছে।
ড. নাসির উদ্দিন আহমেদ বলেন, "অনেক সুযোগ আছে, চ্যালেঞ্জ আছে, নিরাপত্তা ঝুঁকিও আছে। রাজনীতিক ও কূটনীতিকদের বিচক্ষণতার মাধ্যমে আমরা সফল হতে পারি।"
"ইরানকে বোঝাতে হবে যে আমরা তাদের বিপক্ষে নই। আমরা যাচ্ছি শুধু সামুদ্রিক রুটের নিরাপত্তার জন্য। এই কৌশলগত অবস্থান তাদের কাছে পরিষ্কার করতে হবে," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।
এছাড়া এই জোটের অংশ হয়ে বাংলাদেশ কী ভূমিকা রাখবে, ক্ষয়ক্ষতি হলে কে বহন করবে, সৈন্যদের বিমা ও সুযোগ-সুবিধা কী হবে- এই বিষয়গুলোর উত্তর জানাও জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, হরমুজের পর বাব আল-মান্দেবও যদি অস্থির হয়ে পড়ে, তাহলে বিশ্ব অর্থনীতি বড় ধাক্কা খাবে। সেই অর্থনীতির অংশ হিসেবে বাংলাদেশেরও দায়িত্ব রয়েছে। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিজের কূটনৈতিক ভারসাম্য ও নিরাপত্তা যেন বিসর্জন না হয়, সেটিই এখন সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ।- বিবিসি বাংলা
সম্পাদক ও প্রকাশক- মেহেদী হাসান
Copyright © 2026 Livenews24bd সত্যের সাথে প্রতিদিন. All rights reserved.