
সন্তান যেন সৎ, দ্বীনদার ও উত্তম চরিত্রের মানুষ হিসেবে বেড়ে ওঠে, এটি প্রত্যেক বাবা-মায়েরই প্রত্যাশা। ইসলামে হালাল উপার্জন ও পবিত্র খাদ্যের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে, বাবা-মায়ের হারাম উপার্জন বা সন্তানের মুখে তুলে দেওয়া হারাম খাদ্য কি তার চরিত্র ও নৈতিকতার ওপর কোনো প্রভাব ফেলে?
এ বিষয়ে কোরআন, সহিহ হাদিস এবং ইসলামি স্কলারদের ব্যাখ্যা কী, তা নিয়েই এই প্রতিবেদন।
ইসলামে হালাল ও পবিত্র রিজিকের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে পবিত্র খাদ্য গ্রহণের সঙ্গে সৎকাজের গভীর সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে রাসুলগণ, আপনারা পবিত্র বস্তু থেকে আহার করুন এবং সৎকাজ করুন।’ (সুরা মুমিনুন: ৫১)
অন্য আয়াতে মুমিনদের উদ্দেশে বলা হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ, আমি তোমাদের যে পবিত্র রিজিক দিয়েছি, তা থেকে আহার করো।’ (সুরা বাকারা: ১৭২)
মুফাসসিরদের মতে, বিশেষ করে তাফসিরে ইবনে কাসিরে, এই আয়াতগুলোর ব্যাখ্যায় হালাল খাদ্যকে নেক আমল কবুল হওয়ার অন্যতম সহায়ক উপাদান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ কারণেই সন্তানকে হালাল রিজিকে লালন-পালনের ওপর ইসলাম বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।
হারাম উপার্জনের আধ্যাত্মিক ক্ষতির বিষয়ে সহিহ হাদিসে সুস্পষ্ট সতর্কতা এসেছে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) এমন এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেন, যিনি দীর্ঘ সফরের পর দুই হাত তুলে আল্লাহর কাছে দোয়া করছেন। অথচ তাঁর খাদ্য হারাম, পানীয় হারাম, পোশাক হারাম এবং তিনি হারাম উপার্জনে লালিত। তখন রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘এ অবস্থায় তার দোয়া কীভাবে কবুল হবে?’ (সহিহ মুসলিম: ১০১৫)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, হারাম উপার্জন মানুষের ইবাদত ও দোয়া কবুল হওয়ার ক্ষেত্রে বড় অন্তরায় হতে পারে।
কোরআন বা সহিহ হাদিসে এমন কোনো বক্তব্য নেই যে, হারাম খাদ্য গ্রহণ করলেই সন্তান অনিবার্যভাবে খারাপ চরিত্রের, অবাধ্য বা অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠবে। তাই এমন দাবি ইসলামের নামে করা সঠিক নয়।
তবে ইসলামি স্কলাররা বলেন, মানুষের চরিত্র গঠনে পারিবারিক পরিবেশ, ঈমানি শিক্ষা, হালাল উপার্জন, খাদ্যাভ্যাস এবং নৈতিক অনুশীলন সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাব থাকে।
ইমাম ইবনে কাসির (রহ.)-এর তাফসির এবং ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.)-এর বিভিন্ন আলোচনায় হালাল খাদ্যকে অন্তরের পবিত্রতা, তাকওয়া এবং নেক আমলের সহায়ক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ কারণে আলেমরা বলেন, হালাল উপার্জন পরিবারে তাকওয়া ও নৈতিকতার পরিবেশ গড়ে তোলে, যার ইতিবাচক প্রভাব সন্তানের লালন-পালনেও প্রতিফলিত হতে পারে।
ইসলামের একটি মৌলিক নীতি হলো, কেউ অন্যের গুনাহের দায় বহন করবে না।
পবিত্র কোরআনের ভাষায়- ‘কোনো বহনকারী অপরের বোঝা বহন করবে না।’ (সুরা নাজম: ৩৮)
অর্থাৎ, বাবা-মায়ের হারাম উপার্জনের জন্য সন্তান আল্লাহর কাছে দায়ী হবে না। বিশেষ করে নাবালক সন্তান, যে নিজের উপার্জনের সক্ষমতা রাখে না, তার ওপর এ দায় বর্তায় না।
তবে ইসলামি স্কলারদের মতে, সন্তানকে হালাল রিজিকে লালন-পালন করা এবং পরিবারকে হারাম উপার্জন থেকে রক্ষা করা বাবা-মায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
রাসুলুল্লাহ (স.) হারাম উপার্জন ও খাদ্য সম্পর্কে কঠোর সতর্কতা দিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘যে দেহ হারাম দ্বারা পুষ্ট হয়েছে, তার জন্য জাহান্নামের আগুনই অধিক উপযুক্ত।’ (জামে তিরমিজি: ৬১৪)
এই হাদিস একজন মুসলিমকে নিজের ও পরিবারের খাদ্যের উৎস সম্পর্কে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার শিক্ষা দেয়।
হারাম উপার্জনের অন্যতম বড় কারণ হলো অন্যের হক নষ্ট করা। ইসলামি স্কলারদের মতে, যদি কেউ অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রহণ করে, তবে শুধু আল্লাহর কাছে তওবা করাই যথেষ্ট নয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্পদ ফিরিয়ে দিতে হবে অথবা তাঁর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। অন্যথায় তওবা পূর্ণতা লাভ করে না।
ইসলামি স্কলারদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, হালাল রিজিক একটি সুস্থ ঈমানি ও নৈতিক পারিবারিক পরিবেশ গড়ে তুলতে সহায়তা করে। সেই পরিবেশে বেড়ে ওঠা সন্তানের নৈতিক বিকাশের সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পায়। তাই একজন মুসলিমের দায়িত্ব হলো নিজের উপার্জন, পরিবারের খাদ্য এবং জীবনযাপনকে যথাসম্ভব হালাল ও পবিত্র রাখা। কারণ, সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ গঠনে ঈমানি শিক্ষা, উত্তম পরিবেশ এবং হালাল রিজিক- তিনটিই গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
তথ্যসূত্র: আল-কোরআন; সহিহ মুসলিম: ১০১৫; জামে তিরমিজি: ৬১৪; তাফসিরে ইবনে কাসির; ইবনুল কাইয়্যিমের মাদারিজুস সালিকিন
সম্পাদক ও প্রকাশক- মেহেদী হাসান
Copyright © 2026 Livenews24bd সত্যের সাথে প্রতিদিন. All rights reserved.