
‘যুদ্ধে আর প্রেমে সবকিছু চলে’ এই প্রবাদটা বিশ্বকাপেও যেন সত্যি হয়ে উঠল। আর্জেন্টিনা যখন ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে সেমিফাইনালে তুলে দিল, তখন মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি চলল অভিযোগ আর পাল্টা অভিযোগের খেলা। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে ৩১টি ‘নোংরা কৌশল’-এর অভিযোগ তুলে বলেছে, দক্ষিণ আমেরিকানরা মাঠে ‘ডার্ক আর্টস’-এর মাস্টার।
সেমিফাইনালের লড়াইয়ে ম্যাচের শুরু থেকেই উত্তেজনা ছিল তুঙ্গে। মাত্র ১৯ সেকেন্ডে অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার ইলিয়ট অ্যান্ডারসনকে ধাক্কা দেন। এরপর একে একে ঘটে যায় নানা ঘটনা। জুড বেলিংহামকে পেছন থেকে ধাক্কা, এনজো ফার্নান্দেজের ঘাড়ে আঘাত, গিয়ুলিয়ানো সিমিওনের ট্যাকল সবকিছুই নিয়ে দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা বারবার ইংল্যান্ডের আক্রমণ থামাতে ফাউল করেন বলে অভিযোগ। মর্গান রজার্স, রিস জেমস, বেলিংহামকে একের পর এক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়। কখনো বল ধরে সময় নষ্ট, কখনো রেফারির সামনে ঘিরে ধরা, আবার কখনো প্রতিপক্ষের গোলরক্ষককে বিরক্ত করার ঘটনাও ঘটেছে। লিসান্দ্রো মার্টিনেজ, ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর মতো খেলোয়াড়রা শক্ত ট্যাকলে ইংলিশদের থামিয়েছেন।
দ্বিতীয়ার্ধেও পরিস্থিতি শান্ত হয়নি। গোলের পর উদযাপনে রোমেরো পিকফোর্ডের মুখের সামনে চিৎকার করেন। শেষ মুহূর্তে বেলিংহামের রান থামিয়ে উদযাপন, স্ল্যাপের ঘটনা সবই বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ম্যাচ শেষে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা ‘ফকল্যান্ড আর্জেন্টিনার’ ব্যানার দেখানোয় নতুন করে সমালোচনা শুরু হয়েছে। ফিফা আগেই এ ধরনের ব্যানার নিষিদ্ধ করেছিল।
ইংল্যান্ডের কোচ থমাস টুখেলের দলকে আর্জেন্টিনা মানসিকভাবে ভাঙার চেষ্টা করেছে বলে টেলিগ্রাফ দাবি করেছে। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা সমর্থকরা এসবকে সাধারণ ফুটবলীয় কঠিন লড়াই বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন।
রেফারি ইসমাইল এলফাথ অনেক ঘটনায় কার্ড দেখাননি বলেও প্রশ্ন উঠেছে। ম্যাচের পর এই বিতর্ক নিয়ে ফুটবলবিশ্বে আলোচনা চলছে। বিশ্বকাপের এমন উত্তেজক ম্যাচে জয়-পরাজয়ের সঙ্গে মানসিক যুদ্ধও যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা আবারও প্রমাণিত হলো।
আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে ‘৩১টি নোংরা কৌশল’-এর অভিযোগ (দ্য টেলিগ্রাফ-এর বর্ণনা অনুসারে)-
মিনিট ১: ম্যাচ শুরুর মাত্র ১৯ সেকেন্ডের মাথায় অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার ইলিয়ট অ্যান্ডারসনকে ধাক্কা দেন।
মিনিট ২: জুড বেলিংহাম বল ছেড়ে দেওয়ার পরও লিয়ান্দ্রো পারেদেস তাকে পিঠে ধাক্কা দেন, যার ফলে বেলিংহামম মাটিতে পড়ে যান।
মিনিট ৩: প্রথম ঝামেলা। এনজো ফার্নান্দেজ ইলিয়ট অ্যান্ডারসনের ঘাড়ের পেছনে হাত দিয়ে আঘাত করেন। ফাউল ডাকা হয় কিন্তু হলুদ কার্ড দেখানো হয়নি।
মিনিট ৬: ইলিয়ট অ্যান্ডারসন বল জিতে আক্রমণে যাওয়ার সময় গিয়ুলিয়ানো সিমিওনে তাকে ফেলে দেন। রেফারি ফাউল দেন।
মিনিট ১১: এনজো ফার্নান্দেজ ইলিয়ট অ্যান্ডারসনের ওপর ফাউল করেন যা রেফারি ধরেননি। দুজন মাটিতে জড়াজড়ি করে ধস্তাধস্তি করেন।
মিনিট ১১ (দ্বিতীয় ঘটনা): একই সময়ে মর্গান রজার্সকে টাগলিয়াফিকো ফেলে দেন। দুই দলের মধ্যে আরেক দফা ঝামেলার পর ড্রপ বল দিয়ে খেলা শুরু হয় এবং বল আর্জেন্টিনাকে দেওয়া হয়।
মিনিট ১৩: গিয়ুলিয়ানো বল আটকে রেখে ইংল্যান্ডের খেলা শুরু করতে দেরি করেন। পিকফোর্ড বল কেড়ে নিতে গেলে গিয়ুলিয়ানো মাটিতে পড়ে যান।
মিনিট ১৬: লিয়ান্দ্রো পারেদেস মাটিতে পড়ে বল আটকে বেলিংহামমের কাউন্টার অ্যাটাক থামান। ফাউল দেননি রেফারি। পরে দুজনের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়।
মিনিট ১৬ (দ্বিতীয়): অ্যান্থনি গর্ডন খেলা শুরু করতে চাইলে গিয়ুলিয়ানো সিমিওনে তাকে ফেলে দেন। স্পষ্ট ফাউল।
মিনিট ২৪: কর্নার কিকের সময় গিয়ুলিয়ানো সিমিওনে ও জর্ডান পিকফোর্ড একে অপরকে কয়েকবার চড়-থাপ্পড় মারেন। রেফারি সতর্ক করেন।
মিনিট ২৮: রিস জেমস ও মর্গান রজার্স ম্যাক অ্যালিস্টার ও লিসান্দ্রো মার্টিনেজের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে মাটিতে পড়ে যান। থ্রো-ইন আর্জেন্টিনাকে দেওয়া হয়।
মিনিট ৩১: বেলিংহামম গিয়ুলিয়ানো সিমিওনে, ক্রিস্টিয়ান রোমেরো ও এনজো ফার্নান্দেজের মাঝ দিয়ে যাওয়ার সময় চেলসির খেলোয়াড় তাকে ফেলে দেন। ফাউল দিলেও কার্ড দেখানো হয়নি।
মিনিট ৩৩: গিয়ুলিয়ানো সিমিওনে মার্ক গুয়েহির সঙ্গে বলের জন্য লড়াই করতে গিয়ে মাথা দিয়ে ইংলিশ খেলোয়াড়কে ফেলে দেন। ফাউল দিলেও বুকিং হয়নি।
মিনিট ৩৫: নাহুয়েল মলিনা পেনাল্টি এরিয়ার বাঁ কোণে বেলিংহামমকে ফেলে দেন। ফাউল।
মিনিট ৩৬: ইলিয়ট অ্যান্ডারসন মেসির স্ল্যালম রান আটকাতে ফাউল করেন। ম্যাচের প্রথম হলুদ কার্ড দেখেন তিনি।
মিনিট ৩৭: নতুন ঝামেলা। আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা মেসির ওপর ফাউলের প্রতিবাদ করেন, আর ইংল্যান্ড প্রশ্ন তোলে কেন অ্যান্ডারসনই প্রথম হলুদ কার্ড পেলেন।
মিনিট ৪২: লিসান্দ্রো মার্টিনেজ বারবার জড়িয়ে ধরে মর্গান রজার্সের আক্রমণ থামান। ফাউল এবং আর্জেন্টিনার প্রথম হলুদ কার্ড।
৪৫+১ মিনিট: রিস জেমস দ্রুত থ্রো-ইন করতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু আর্জেন্টিনার বেঞ্চ থেকে মাঠের ভেতর বল ছুড়ে দেওয়া হয়।
৪৫+৩ মিনিট: পারেদেস রিস জেমসের ওপর ফাউল করেন। তার স্টাডস বুকের উচ্চতায় উঠে যায়।
প্রথমার্ধ শেষে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা রেফারিকে ঘিরে ধরেন। মেসি টানেলের দিকে যাওয়ার সময়ও প্রতিবাদ চালিয়ে যান।
মিনিট ৪৮: বেলিংহামম মেসির আক্রমণ আটকান। বল সাইড লাইনের বাইরে চলে গেলেও মেসি বেলিংহামমকে জড়িয়ে ধরে ফেলে দেন।
মিনিট ৫১: ক্রিস্টিয়ান রোমেরো দুই হাত দিয়ে বেলিংহামমকে জড়িয়ে আটকান। হলুদ কার্ড দেখানো হয়।
মিনিট ৫৩: ডেড স্পেন্স গিয়ুলিয়ানো সিমিওনের কাছ থেকে মুখে চড় খাওয়ার অভিযোগ করেন। কিন্তু রেফারি আগেই আর্জেন্টিনার পক্ষে ফাউল দিয়েছিলেন।
মিনিট ৫৮: ক্রিস্টিয়ান রোমেরো পিকফোর্ডের রাস্তা আটকে দেন। পিকফোর্ড রোমেরোর ওপর পড়ে যান।
মিনিট ৭৩: ইংল্যান্ডের থ্রো-ইনের সময় মেসি ডেড স্পেন্সকে হালকা ধাক্কা দেন।
মিনিট ৮৫: এনজো ফার্নান্দেজ সমতা (১-১) করার পর ক্রিস্টিয়ান রোমেরো সেলিব্রেশন করতে গিয়ে পিকফোর্ডের মুখের সামনে চিৎকার করেন।
মিনিট ৮৮: জন স্টোনস হেড করে বল ক্লিয়ার করার পর অস্বাভাবিকভাবে পড়ে যান। লাউতারো মার্টিনেজ দেখতে আসেন, আর ডি পল, মন্টিয়েল, ওতামেন্দি ও রোমেরো রেফারিকে ঘিরে ধরে খেলা থামানো উচিত ছিল বলে প্রতিবাদ করেন।
মিনিট ৯২: আর্জেন্টিনা বেলিংহামমের রান আটকে দেয়। তারপর মন্টিয়েল তাৎক্ষণিকভাবে ঘুরে বেলিংহামমের মুখের সামনে উদযাপন করেন।
এ সময় ডিন হেন্ডারসন লাউতারো মার্টিনেজকে ধাক্কা দেন এবং মর্গান রজার্স অন্য আর্জেন্টিনা খেলোয়াড়দের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। সবচেয়ে বড় ঘটনা — বেলিংহামম ভ্যালেন্টিন বার্কোর মাথার পেছনে চড় মারেন।
ম্যাচের পর
আর্জেন্টিনার কয়েকজন খেলোয়াড় “ফকল্যান্ড আর্জেন্টিনার” ব্যানার প্রদর্শন করেন। ফিফা আগেই এ ধরনের ব্যানার নিষিদ্ধ করেছিল।
সম্পাদক ও প্রকাশক- মেহেদী হাসান
Copyright © 2026 Livenews24bd সত্যের সাথে প্রতিদিন. All rights reserved.