বিয়ে একটি পবিত্র ইবাদত ও রাসুলুল্লাহ (স.)-এর গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ। সুখী ও স্থায়ী দাম্পত্যের ভিত্তি স্থাপিত হয় বিয়ের আগের সঠিক প্রস্তুতি ও ইসলামি বিধিবিধানের ওপর। রাসুল (স.)-এর আদর্শ অনুসরণ করলে বিয়ে সহজ হয় এবং তাতে আল্লাহর বিশেষ রহমত নাজিল হয়। বিয়ের আগে পালনীয় ৯টি সুন্নাহ ও আদব নিচে তুলে ধরা হলো-
১. দ্বীনদার জীবনসঙ্গী নির্বাচন
জীবনসঙ্গী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ইসলাম বংশমর্যাদা, সম্পদ বা সৌন্দর্যের তুলনায় দ্বীনদারি ও নৈতিকতাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে। রাসুল (স.) দ্বীনদার পাত্রী নির্বাচনের নির্দেশ দিয়েছেন, যা মূলত সফল দাম্পত্যের মূল ভিত্তি। (সহিহ বুখারি: ৫০৯০; সহিহ মুসলিম: ১৪৬৬; তিরমিজি: ১০৮৫)
২. অবৈধ সম্পর্ক বর্জন
বিয়ের আগে তথাকথিত প্রেম বা হারাম সম্পর্ক থেকে দূরে থাকা মুমিনের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য। পবিত্র কোরআনে ব্যভিচারকে চরম অশ্লীলতা ও নিকৃষ্ট পথ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং এর ধারেকাছে না যাওয়ার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। (সুরা বনি ইসরাঈল: ৩২)
৩. ইস্তেখারা বা সঠিক সিদ্ধান্ত প্রার্থনা
বিয়ের মতো জীবনের প্রধান সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে আল্লাহর কাছে পথনির্দেশ চাওয়া সুন্নাহ। রাসুল (স.) সাহাবিদের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে ইস্তেখারা করার শিক্ষা দিতেন। (সহিহ ইবনে হিব্বান: ৪০৪০; মুসনাদে আহমদ: ২৩৫৯৬)
৪. পারিবারিক পরামর্শ ও মাশওয়ারা
বিয়ের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নিজের ইচ্ছার পাশাপাশি অভিভাবক ও অভিজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করা সুন্নাহ। বড়দের সুচিন্তিত মতামত বিয়ের বরকত বৃদ্ধিতে এবং অনাকাঙ্ক্ষিত সংকট এড়াতে সহায়ক হয়। (মুসনাদে আহমদ: ২৩৭৯৩; আলবাহরুর রায়েক: ৩/১০৯; ফাতহুল কাদির: ৩/১৫৭)
৫. পাত্র-পাত্রী পরস্পরকে দেখা
বিয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে পাত্র ও পাত্রী একে অপরকে শরিয়তের নির্ধারিত সীমার মধ্যে দেখে নেওয়া সুন্নাহ। রাসুল (স.) জানিয়েছেন, এটি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে হৃদ্যতা ও ভালোবাসা স্থায়ী হওয়ার ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখে। (সুনানে তিরমিজি: ১০৮৭; সুনানে নাসায়ি: ৩২৩৫)
৬. পাত্র-পাত্রীর সম্মতি ও মতামত
বিয়ের ক্ষেত্রে পাত্র ও পাত্রীর নিজস্ব সম্মতি ও সন্তুষ্টির গুরুত্ব অপরিসীম। রাসুল (স.) নারীর সুস্পষ্ট সম্মতি ছাড়া তাকে বিয়ে দিতে নিষেধ করেছেন। এটি দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত করে। (সহিহ বুখারি: ৫১৩৬; সহিহ মুসলিম: ১৪১৯)
৭. বিয়ের প্রস্তাব ও শিষ্টাচার
বিয়ের জন্য পারিবারিকভাবে প্রস্তাব পাঠানো একটি আদর্শ পদ্ধতি। তবে ইসলাম শিখিয়েছে যে, কোনো ভাইয়ের প্রেরিত বিয়ের প্রস্তাবের ওপর প্রস্তাব দেওয়া যাবে না, যতক্ষণ না প্রথম প্রস্তাবটি বাতিল হয়। (সহিহ বুখারি: ৫১৪২)
৮. সহজ মোহর নির্ধারণ
বিয়ের মোহরকে সাধ্যের মধ্যে রাখা এবং এটি নিয়ে কড়াকড়ি না করা সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত। রাসুল (স.)-এর ভাষ্যমতে, সেই বিবাহ সবচেয়ে বেশি বরকতময়, যার ব্যয়ভার ও মোহর নির্ধারণ পদ্ধতি সহজ হয়। (মুসনাদে আহমদ: ২৪৫২৯; মুস্তাদরাকে হাকিম: ২৭৪২; রদ্দুল মুহতার: ৩/১০২; মাজমাউজ জাওয়ায়েদ: ৭৫০৭; তাফসিরে কুরতুবি: ৫/৬৭)
৯. বিয়ের ঘোষণা ও প্রচার
ইসলামে বিবাহ কোনো গোপন বিষয় নয়, বরং তা সামাজিকভাবে প্রচার ও ঘোষণার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে নবদম্পতির সামাজিক স্বীকৃতি নিশ্চিত হয় এবং বিভ্রান্তি বা কুৎসা দূর হয়। (মুসনাদে আহমদ: ৪/৫; তিরমিজি: ১০৮৯; ইবনে মাজাহ: ১৮৯৫)
বিয়ের এই সুন্নাহ ও আদবগুলো সুন্দর পরিবার গঠনের মূল স্তম্ভ। জাগতিক আড়ম্বরের চেয়ে রাসুল (স.)-এর আদর্শকে অগ্রাধিকার দিলে দাম্পত্য জীবন হয় নিরাপদ, দীর্ঘস্থায়ী ও আনন্দময়।
