রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘আলেমরা হলো নবীদের উত্তরসূরি।’ (সুনানে আবু দাউদ: ৩৬৪১)। নবীযুগের আলেম বা সাহাবায়ে কিরাম ছিলেন এই বাণীর জীবন্ত প্রতিফলন। তাঁদের জ্ঞান কেবল মস্তিষ্কের তথ্য ছিল না, বরং তা ছিল হৃদয়ের নূর ও কর্মের প্রতিফলন। তাঁদের বিনয়, আল্লাহভীতি এবং নিঃস্বার্থ সেবা বর্তমান প্রজন্মের জন্য এক শাশ্বত আদর্শ।
নবীযুগের আলেমদের জীবন ও আচরণের প্রধান কিছু দিক নিচে তুলে ধরা হলো-
১. গভীর আল্লাহভীতি
নবীযুগের আলেমদের জ্ঞানের মূল ভিত্তি ছিল আল্লাহভীতি। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে কেবল আলেমরাই তাঁকে (যথাযথভাবে) ভয় করে।’ (সুরা ফাতির: ২৮)
বাস্তব উদাহরণ: হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলতেন, ‘প্রচুর হাদিস বর্ণনা করার নাম জ্ঞান নয়, বরং প্রকৃত জ্ঞান হলো আল্লাহকে ভয় করা।’ কোনো একটি মাসআলা বলার সময় তাঁর চেহারা ভয়ে বিবর্ণ হয়ে যেত, পাছে আল্লাহর নামে কোনো ভুল কথা বলে ফেলেন।
২. অতুলনীয় বিনয় ও নম্রতা
তাঁরা ছিলেন জ্ঞানের পাহাড়, কিন্তু আচরণে ছিলেন অতি সাধারণ। নিজের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করার লেশমাত্র মানসিকতা তাঁদের ছিল না। সত্য গ্রহণে তাঁরা ছিলেন উন্মুক্ত হৃদয়ের অধিকারী।
বাস্তব উদাহরণ: একদা খলিফা ওমর (রা.) মিম্বরে দাঁড়িয়ে মোহরানা নির্দিষ্ট করার প্রস্তাব দিলেন। এক সাধারণ নারী দাঁড়িয়ে কোরআন থেকে এর প্রতিবাদ করলেন। ওমর (রা.) নিজের ভুল বুঝতে পেরে সবার সামনে অকপটে বললেন, ‘মহিলাটি সঠিক বলেছে, আর ওমর ভুল করেছে।’ সত্যের সামনে এই বিনয়ই ছিল তাঁদের শক্তি।
৩. আমল ও ইলমের সমন্বয়
নবীযুগের আলেমরা যা জানতেন, আগে তা নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করতেন। হজরত আবু আবদুর রহমান সুলামি (রা.) বলেন, ‘সাহাবায়ে কেরাম আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন- তাঁরা যখন রাসুলুল্লাহ (স.)-এর কাছে ১০টি আয়াত শিখতেন, যতক্ষণ না সেগুলো জীবনে বাস্তবায়ন করতেন, ততক্ষণ পরের ১০টি আয়াতে যেতেন না।’ তাঁরা মনে করতেন, যে জ্ঞানের সাথে আমল নেই, তা কেয়ামতের দিন নিজের বিরুদ্ধেই দলিল হিসেবে দাঁড়াবে।
৪. দুনিয়াবিমুখতা ও অনাড়ম্বর জীবন
তাঁরা ইলমকে দুনিয়া কামানোর মাধ্যম বানাতেন না। ধন-সম্পদ বা পদের মোহ তাঁদের স্পর্শ করতে পারত না।
বাস্তব উদাহরণ: সিরিয়ার গভর্নর থাকাকালীন হজরত আবু দারদা (রা.)-এর ঘরে যখন মেহমান এল, তাঁরা দেখলেন ঘরে কোনো আসবাবপত্র নেই। মেহমানরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, ‘আমাদের আসল ঘর (আখেরাত) সামনে, আমরা যা কিছু কামাই করি সব সেখানে পাঠিয়ে দিই।’
৫. মানুষের প্রতি দয়া ও সহানুভূতি
তাঁরা মানুষের ভুল ধরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে ছিলেন অত্যন্ত কোমল। কঠোরতা নয়, বরং মমতা দিয়ে তাঁরা মানুষকে দ্বীনের পথে ডাকতেন।
বাস্তব উদাহরণ: যখন এক যুবক ব্যভিচারের অনুমতি চেয়ে রাসুলুল্লাহ (স.)-এর কাছে এল, সাহাবারা ক্ষুব্ধ হলেন। কিন্তু রাসুল (স.) তাকে কাছে ডেকে মমতার সাথে বুঝালেন। এই শিক্ষা সাহাবারাও ধারণ করেছিলেন। তাঁরা মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করাকে ইবাদত মনে করতেন।
৬. সত্যের পথে আপসহীনতা
নবীযুগের আলেমরা হকের ব্যাপারে ছিলেন অকুতোভয়। সত্য বলতে গিয়ে তাঁরা কোনো নিন্দুকের নিন্দাকে ভয় পেতেন না। ন্যায়ের আদেশ এবং অন্যায়ের প্রতিরোধে তাঁরা ছিলেন অগ্রসেনানী।
সমসাময়িক প্রেক্ষাপট: আজকের প্রয়োজন
বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে জ্ঞানের অভাব নেই, কিন্তু নবীযুগের আলেমদের সেই ‘নুরানি আচরণের’ অভাব প্রকট। বর্তমান সমাজে আলেমদের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা অটুট রাখতে সাহাবায়ে কেরামের সেই বিনয় ও আমলি জীবনের আদর্শ অনুসরণ অপরিহার্য। আজকের আলেম সমাজ যদি সাহাবায়ে কেরামের মতো সহজলভ্য ও দয়ালু হন, তবে সমাজে নৈতিক বিপ্লব ঘটানো সম্ভব। ইলম যখন কেবল বিতর্কের মাধ্যম না হয়ে আচরণের মাধ্যমে প্রকাশিত হবে, তখনই সমাজ শান্তির পথ খুঁজে পাবে।
নবীযুগের আলেমদের জীবন ছিল রাসুলুল্লাহ (স.)-এর চরিত্রের সরাসরি প্রতিচ্ছবি। তাঁদের জ্ঞান তাঁদের দাম্ভিক করেনি; বরং আরও বেশি বিনয়ী ও পরোপকারী করেছে। দ্বীন প্রচারে তাঁদের মূল অস্ত্র ছিল চরিত্র। বর্তমান প্রজন্মের আলেমদের জন্য সাহাবায়ে কেরামের এই সুমহান জীবনদর্শনই হতে পারে সাফল্যের একমাত্র পথ।
