
চলছে খোঁড়াখুঁড়ি, দূর থেকে শোনা যাচ্ছে হাতুড়ি-পেরেকের ঠুকঠাক শব্দ। বাঁশ আর কাঠে সাজানো হচ্ছে স্টল, কেউ মাপ নিচ্ছে ফিতা টেনে, কেউ দড়ি টানছে জায়গা ঠিক করতে। এই প্রস্তুতি আর উৎসাহের মাঝেই শুরুর অপেক্ষায় অমর একুশে বইমেলা। ভাষাশহীদদের স্মরণে বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মেলা সাজানো চলছে পুরোদমে।
সাধারণত প্রতি বছর পহেলা ফেব্রুয়ারি মাসব্যাপী বইমেলা চলে। এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কারণে ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে মেলা শুরু হবে। আয়োজক প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যেই সব প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও বাংলা একাডেমিতে স্টল এবং প্যাভিলিয়ন নির্মাণের কাজ এখনো চলমান। ২০ ফেব্রুয়ারির আগেই সব কাজ শেষ হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বিভিন্ন প্রকাশনার জন্য স্টলগুলো বাঁশ দিয়ে সাজানো হচ্ছে। মাঝে মাঝে দর্শনার্থী, লেখক ও প্রকাশকরা এসে প্রাঙ্গণ পরিদর্শন করছেন।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কথা হয় লেখক হাসান মাহমুদের সঙ্গে। এবার তার নতুন একটি বই বের হচ্ছে এবং তিনি অধীর আগ্রহে বইমেলা শুরু হওয়ার অপেক্ষায় আছেন।

ঢাকা মেইলকে হাসান মাহমুদ বলেন, ‘লেখকরা সবসময় বইমেলার অপেক্ষায় থাকেন। বইমেলায় পাঠক ও লেখকের মধ্যে একটি মেলবন্ধন তৈরি হয়, যা লেখককে উৎসাহ দেয় এবং অনুপ্রেরণা যোগায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার কাছে বইমেলা মানে শুধু বই বিক্রি নয়; এটি পাঠক ও লেখকের হৃদয়ের সংযোগস্থল। এখানে এসে বুঝতে পারি, লেখা শুধু কাগজে নয়-মানুষের মনে বেঁচে থাকার জন্য। তাই প্রতি বছর বইমেলার অপেক্ষায় থাকি, নতুন স্বপ্ন আর নতুন গল্প নিয়ে পাঠকদের সামনে দাঁড়ানোর আশায়।’
নবীন লেখক ফাহিম আরিফ তার নতুন উপন্যাস প্রকাশ উপলক্ষে নিয়মিতই আসছেন বইমেলা প্রাঙ্গণে এবং অপেক্ষায় আছেন বইমেলা শুরুর। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বছরজুড়ে লিখি। বইমেলায় পাঠকের হাতে নিজের বই দেখতে পাওয়া, তাদের ভালোবাসা আর সরাসরি মতামত শোনা-এটাই একজন লেখকের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। পাঠকদের উৎসাহ নতুন গল্প লেখার অনুপ্রেরণা দেয়।’
কথাসাহিত্যিক সাবিহা রহমান জানান, “বইমেলা আমাদের জন্য শুধু বই বিক্রির জায়গা নয়, এটি আবেগের স্থান। সারা বছর যে লেখাগুলো নিয়ে কাজ করি, সেগুলো পাঠকের হাতে তুলে দেওয়ার সুযোগ পাই এই মেলাতেই। নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন আর পাঠকদের সরাসরি প্রতিক্রিয়া-এই অনুভূতি অন্য কোথাও পাওয়া যায় না।’
তিনি আরও বলেন, ‘বইমেলা মানেই এক ধরনের নতুন সূচনা। পাঠকদের সঙ্গে ভাবনার আদান-প্রদান হয়, নতুন লেখার অনুপ্রেরণা পাওয়া যায়। বিশেষ করে তরুণ পাঠকদের আগ্রহ আমাদের দায়িত্ব আরো বাড়িয়ে দেয়। তাই প্রতিবছর বইমেলা ঘিরে আলাদা উত্তেজনা কাজ করে।’
বইমেলার প্রস্তুতি সম্পর্কে আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি জানায়, ২০ ফেব্রুয়ারি বইমেলা উদ্বোধনের জন্য ৯০ শতাংশ প্রস্তুতি নেওয়া হয়ে গেছে। রেওয়াজ অনুযায়ী একুশে বইমেলা উদ্বোধন করে থাকেন সরকারপ্রধান। এবারও তাই হতে পারে। বইমেলায় অংশ নিতে প্রায় ৪০০ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান স্টলের ভাড়াও পরিশোধ করেছে, আরো কিছু প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ইতোমধ্যে ৫১৫ ইউনিট স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে পাঁচ শতাধিক প্রকাশনীর মধ্যে ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে মেলা আয়োজনের সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করেছেন তিন শতাধিক প্রকাশনী।

৩২১টি প্রকাশনীর প্রকাশকরা বলছেন, রোজার সময় মেলার আয়োজন হলে পাঠকশূন্যতায় ভুগতে হবে। এ সময় মানুষ বইয়ের বদলে ঈদের পোশাক কেনাকাটা নিয়ে ব্যস্ত থাকবে।
ফলে, প্রকাশকরা চরম আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবেন। বরং ঈদের পর মেলা হলে লোকসানের বোঝা বইতে হতো না তাদের। সেই সময় উৎসব আমেজে পাঠকরা বই কিনতো। এমন বাস্তবতায় রোজার মধ্যে বইমেলা হলে ৩২১টি প্রকাশনী মেলা বয়কট করতে পারেন। এমনকি একাডেমির পক্ষ থেকে প্রকাশকদের স্টল ভাড়া ৫৫ শতাংশ মওকুফের ঘোষণা দেওয়া হলে মেলা বয়কটের সিদ্ধান্তের বিষয়ে অনড় অবস্থানে রয়েছে প্রকাশনীগুলো।
প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বাবুইয়ের কর্ণধার কাদের বাবু বলেন, ‘মেলা বর্জন নয়, প্রকাশকদের চাওয়া ছিল একটি ‘সফল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক মেলা’। তাদের দাবি ছিল পবিত্র রমজান ও নির্বাচন–পরবর্তী পরিস্থিতি বিবেচনায় মেলাটি পিছিয়ে ঈদুল ফিতরের পর আয়োজন করার জন্য, যখন পাঠকদের হাতে সময় ও অর্থ-উভয়ই থাকবে। কিন্তু যৌক্তিক এই দাবিগুলো উপেক্ষা করে এক প্রকার জোর করেই প্রকাশকদের একটি ব্যর্থ মেলার দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। যে মেলায় দেশের সামনের সারির প্রায় সব প্রকাশকসহ তিন শতাধিক মূলধারার প্রকাশক অংশ নিতে অপারগ।’
কিংবদন্তী পাবলিকেশনের কর্ণধার অঞ্জন হাসান পবন বলেন, ‘অমর একুশে বইমেলা বাংলা ভাষাভাষি প্রকাশক, লেখক ও পাঠকদের আবেগের জায়গা। আমরা সারাবছর অপেক্ষা করি এই সময়টার জন্য। অথচ ২০২৬ সালের বইমেলা আয়োজন নিয়ে যথেষ্ট জলঘোলা হয়েছে। এতটাই ঘোলা হয়েছে যে, মূলধারার সৃজনশীল প্রকাশকরা এখন মৃতপ্রায়। বইমেলার আয়োজনকারী প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি নামমাত্র একটি বইমেলার আয়োজন করে তাদের দায় সারতে চাচ্ছে।’
এদিকে অমর একুশে বইমেলা ২০২৬-এর স্টল ভাড়া ৫৫ শতাংশ মওকুফের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। বইমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ড. মো. সেলিম রেজার এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আসন্ন অমর একুশে বইমেলা-২০২৬ আয়োজন উপলক্ষে প্রকাশকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভা ১০ ফেব্রুয়ারি বিকেলে বাংলা একাডেমির শহীদ মুনীর চৌধুরী সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। সভায় প্রকাশকরা প্রকাশনা শিল্পের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে সরকারের কাছে বিভিন্ন দাবি জানান।
সংস্কৃতি উপদেষ্টা গ্রন্থনীতি প্রণয়নসহ অধিকাংশ দাবির সঙ্গে একমত প্রকাশ করে এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে লিখিত প্রস্তাব দেওয়ার আহ্বান জানান। এসময় তিনি আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হতে যাওয়া বইমেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশকদের স্টল ভাড়ার ওপর সরকারের পক্ষ থেকে ৫৫ শতাংশ মওকুফের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন।
বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়, যেসব প্রকাশক ইতোমধ্যে স্টল ভাড়ার টাকা জমা দিয়েছেন, তাদের অতিরিক্ত অর্থ বইমেলা কর্তৃপক্ষ ফেরত দেবে। আর যারা এখনো টাকা জমা দেননি, তারা নতুন নির্ধারিত হারে সরাসরি জমা দিতে পারবেন।
বাংলা একাডেমির বিজ্ঞপ্তির পর পাল্টা বিবৃতি দেন প্রকাশকরা। বিজ্ঞপ্তিতে তারা বলেন, প্রকাশকদের মূল আপত্তি কেবল ভাড়া নিয়ে ছিল না, বরং মেলার সময়সূচি নিয়ে। নির্বাচন ও নতুন সরকার গঠনপরবর্তী সময়ে রোজার বন্ধে পাঠকশূন্য মেলায় ৫৫ শতাংশ কেন, ১০০ শতাংশ ভাড়া মওকুফ করলেও প্রকাশকদের লগ্নিকৃত পুঁজি (বই ছাপা, কর্মীদের বেতন, ডেকোরেশন) উঠে আসবে না। একটি ‘প্রাণহীন’ মেলা আয়োজনের সরকারি সিদ্ধান্তের দায়ভার প্রকাশকেরা নিতে পারবেন না।
জানতে চাইলে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘বইমেলার প্রস্তুতি যেভাবে নেওয়ার কথা সেভাবেই নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে নতুন সরকার আসতে যাচ্ছে, তারা যদি ভিন্ন কোনো বিধিনিষেধ না দেয়, তাহলে আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে বইমেলা শুরু হচ্ছে। ইতোমধ্যে আমরা সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি, তারা আমাদের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কথা জানিয়েছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘বইমেলা আর দেরি করার আশঙ্কা দেখছি না। তবে প্রকাশকরা নানা ধরনের কথা বলতে পারে। আর তাদের প্রাতিষ্ঠানিক কোনো দায় নেই।’
অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম বলেন, ‘গত ১৭ ডিসেম্বর এক সভায় নয়জন প্রকাশকের উপস্থিতিতে তাদের স্বাক্ষরসহ ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে মেলা আয়োজনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সেই সময় বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির (বাপুস) প্রতিনিধিরাও উপস্থিতি ছিলেন। অথচ এখন তারা মেলা পেছানোর দাবি জানাচ্ছেন। এটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। মেলা পেছানোর কোনো সুযোগ নেই। কারণ, মেলার ষাট ভাগের বেশি কাজ সম্পন্ন হয়ে গেছে। আসলে প্রকাশকদের একাংশ চাচ্ছেন বইমেলা না হোক। এছাড়া ঈদের পর মেলা করতে হলে এপ্রিল মাসে করতে হবে। ওই সময় প্রচুর গরমের পাশাপাশি বৃষ্টি, ধুলাবালি ও কালবৈশাখী ঝড়ের আশঙ্কা থাকে। এছাড়া ঈদের পর শ্রমিক সংকটও তীব্র হয়, যা প্রকাশকদের জন্য বাড়তি সমস্যা তৈরি করবে।’
সম্পাদক ও প্রকাশক- মেহেদী হাসান
Copyright © 2026 Livenews24bd সত্যের সাথে প্রতিদিন. All rights reserved.