শবে বরাত বা ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’ মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমা ও রহমত লাভের এক বিশেষ রজনী। এই রাতে ইবাদত-বন্দেগি করা নিঃসন্দেহে সওয়াবের কাজ। তবে আমাদের সমাজে, বিশেষ করে নারীদের মধ্যে শবে বরাতকে কেন্দ্র করে এমন কিছু আমল প্রচলিত রয়েছে, যার কোনো সুস্পষ্ট দালিলিক ভিত্তি নেই। ইসলামি পরিভাষায় এসব আমলকে ‘বিদআত’ বা দ্বীনের মধ্যে নব-উদ্ভাবিত প্রথা বলা হয়। সওয়াবের নিয়তে এসব ভুল আমল করলে উল্টো গুনাহে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
শবে বরাতকে কেন্দ্র করে প্রচলিত ৩টি বড় ভুল ও সে সম্পর্কে শরিয়তের সঠিক মায়ালা নিচে তুলে ধরা হলো-
১. নির্দিষ্ট নিয়মে ‘বরাতের নামাজ’ পড়া
আমাদের সমাজে অনেক নারী মনে করেন, শবে বরাতে নির্দিষ্টভাবে ১২ রাকাত নামাজ পড়তে হয় এবং প্রতি রাকাতে সুরা ফাতেহার পর নির্দিষ্ট সংখ্যক সুরা কদর বা সুরা ইখলাস পড়া আবশ্যক।
সঠিক মায়ালা: শরিয়তে শবে বরাতের জন্য নির্দিষ্ট কোনো নামাজ, নির্দিষ্ট রাকাত সংখ্যা কিংবা নির্দিষ্ট সুরা পাঠের নিয়ম প্রমাণিত নয়। নফল নামাজ অন্য সাধারণ সময়ের মতোই ২ রাকাত করে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী পড়া যাবে। কোনো নির্দিষ্ট রাকাত বা সুরাকে জরুরি মনে করা বিদআতের অন্তর্ভুক্ত। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের দ্বীনের মধ্যে এমন কিছু সংযোজন করল যা তাতে নেই, তা প্রত্যাখ্যাত।’ (সহিহ বুখারি: ২৬৯৭)
২. কেবল শবে বরাতের উদ্দেশ্যে একটি রোজা রাখা
অনেকেই মনে করেন, শবে বরাতের পরের দিন (১৫ই শাবান) একটি রোজা রাখা এই রাতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কেউ কেউ একে ‘বরাতের রোজা’ নামেও অভিহিত করেন।
সঠিক মায়ালা: শবে বরাতকে কেন্দ্র করে নির্দিষ্টভাবে কেবল একটি রোজা রাখার ব্যাপারে সহিহ হাদিসে কোনো নির্দেশনা নেই। তবে শাবান মাসজুড়ে বেশি বেশি নফল রোজা রাখা সুন্নাহ। পাশাপাশি আইয়ামে বিজ (মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ)-এর রোজার সাধারণ সুন্নাহর নিয়তে এই রোজা রাখা যেতে পারে। উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.) বলেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ (স.)-কে রমজান ছাড়া শাবান মাসের মতো এত অধিক রোজা রাখতে আর কখনো দেখিনি।’ (সহিহ বুখারি: ১৯৬৯; সহিহ মুসলিম: ১১৫৬)
৩. সারা রাত জেগে থাকাকে ‘সুন্নত’ মনে করা
অনেকে মনে করেন, শবে বরাতে সারা রাত জেগে থাকা আবশ্যক বা সুন্নতে মোয়াক্কাদা। এমনকি এতে ফজরের নামাজ কাজা হলেও বিষয়টিকে তারা গুরুত্ব দেন না।
সঠিক মাসয়ালা: সামর্থ্য অনুযায়ী এই রাতে ইবাদত করা নেক কাজ। তবে সারা রাত জাগাকেই ‘সুন্নত’ বা ‘বাধ্যতামূলক’ মনে করা ভুল। নফল ইবাদতের ক্লান্তি যেন ফজরের ফরজ নামাজকে বাধাগ্রস্ত না করে, সেদিকে সর্বোচ্চ খেয়াল রাখতে হবে। ফরজের গুরুত্ব নফলের চেয়ে অনেক বেশি।
বিদআত কেন ভয়াবহ?
বিদআত হলো- দ্বীনের মধ্যে এমন কিছু নতুন আমল সওয়াবের আশায় সংযোজন করা, যা রাসুলুল্লাহ (স.) ও সাহাবায়ে কেরাম করেননি। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই সর্বোত্তম বাণী আল্লাহর কিতাব এবং সর্বোত্তম আদর্শ মুহাম্মদ (স.)-এর আদর্শ। আর নিকৃষ্টতম কাজ হলো দ্বীনের মধ্যে নতুন উদ্ভাবিত বিষয়সমূহ এবং নতুন উদ্ভাবিত বিষয়গুলো হলো বিদআত আর বিদআতের পরিণাম জাহান্নাম।’ (সুনানে নাসায়ি: ১৫৭৮)
নারীদের প্রতি বিশেষ পরামর্শ
- আমল করার আগে নির্ভরযোগ্য আলেম বা দালিলিক উৎস থেকে মাসয়ালা যাচাই করুন।
- লোকদেখানো ইবাদত পরিহার করে ঘরের নির্জনে আল্লাহর নিকট তওবা করুন।
- হালুয়া-রুটি বা রান্নাবান্নার আয়োজনে ব্যস্ত হয়ে তওবা ও জিকিরের মূল্যবান সময় নষ্ট করবেন না।
- নফল নামাজের চেয়ে ফরজ (এশা ও ফজর) নামাজ জামাতে বা সঠিক সময়ে আদায়ের প্রতি যত্নশীল হন।
শবে বরাত হোক বিশুদ্ধ তওবা, সহিহ আমল ও বিদআতমুক্ত ইবাদতের রজনী। প্রচলিত কুসংস্কার পরিহার করে রাসুলুল্লাহ (স.)-এর দেখানো সুন্নাহর পথে আমল করাই হোক আমাদের লক্ষ্য। আল্লাহ তাআলা আমাদের মা-বোনদের সঠিক বুঝ ও আমলের তাওফিক দান করুন। আমিন।
